বাংলাদেশে সংস্কৃত সাহিত্যচর্চা দীর্ঘকাল ধরে হিন্দু পণ্ডিত ও গবেষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সেই ধারা ভেঙে এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছিলেন অধ্যাপক ফয়জুন্নেছা বেগম। তিনিই প্রথম মুসলিম নারী গবেষক যিনি সংস্কৃত সাহিত্যে পিএইচডি অর্জন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।
ফয়জুন্নেছা বেগমের জন্ম ১৯৪০ সালে ত্রিপুরার কৈলাশহরে। তবে তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার খিচমতখানিয়ামোড়া গ্রামে। তাঁর পিতা মরহুম আলহাজ্ব নূরউদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন সুপ্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। শিক্ষানুরাগী পরিবারে বেড়ে ওঠায় ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন।
তিনি কৈলাশহর রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয় থেকে ১৯৬১ সালে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে খ্যাতনামা গবেষক ড. শহীদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে সংস্কৃত বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি সংস্কৃত বিষয়ে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন, যা ছিল তাঁর একাডেমিক জীবনের অন্যতম মাইলফলক।
১৯৬৪ সালের শেষদিকে ফয়জুন্নেছা বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। তখনো বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ একত্রে ছিল। ১৯৭১ সালে যখন দুটি পৃথক বিভাগে বিভক্ত হয়, তিনি সংস্কৃত বিভাগে যোগ দেন।
শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্বে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। ১৯৭১ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এক দশক তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিভাগটি গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
অধ্যাপিকা ফয়জুন্নেছা বেগম ১৯৮৭ সালে ভারতের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো— বাংলাদেশের মুসলিম গবেষকদের মধ্যে তিনিই প্রথম যিনি সংস্কৃত সাহিত্যে ডক্টরেট অর্জন করেন। এ অর্জন তাঁকে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে।
তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ সংস্কৃত সাহিত্যের পাঠক ও গবেষকদের কাছে অমূল্য সম্পদ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
- সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস
- কালিদাসের মেঘদূত কাব্য (সম্পাদনা)
- শ্রীহট্টের নৈষধচরিত কাব্যের নবম সর্গ (সম্পাদনা)
তাঁর গবেষণাকর্ম শুধু পাঠ্যবই হিসেবে নয়, গবেষণাধর্মী রেফারেন্স বই হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
অধ্যাপক ফয়জুন্নেছা বেগম ছিলেন শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন পথপ্রদর্শক। মুসলিম নারীদের জন্য তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে সংস্কৃত সাহিত্যচর্চা কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—বাংলাদেশি নারীরাও এ ক্ষেত্রে কৃতিত্ব অর্জন করতে পারেন। বাংলাদেশের শিক্ষা ও গবেষণার ইতিহাসে ফয়জুন্নেছা বেগম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। সংস্কৃত সাহিত্যে তাঁর অবদান, বিশেষত প্রথম মুসলিম নারী পিএইচডি হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি, নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে আজও এবং ভবিষ্যতেও।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৩, ২০২৫