ফেনীর ইজ্জতপুর গ্রামে ২রা ডিসেম্বর ১৯১০ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল হক। প্রারম্ভিক শিক্ষাজীবন তাঁর পৈতৃক নিবাসে সম্পন্ন হলেও, তিনি নিজে শিক্ষার আলোকে ত্যাগ ও উদ্যমের সঙ্গে অনুসরণ করেন। ঢাকা, কলকাতা ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার মাধ্যমে তাঁর শিক্ষাজীবন বৈশ্বিক মানের শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে কৃতিত্বসহ এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং বি.বি স্বর্ণপদক লাভ করে শিক্ষাজগতে প্রথম পদক্ষেপ রাখেন।

শিক্ষাজীবনে অধ্যাপক শামসুল হক ছিলেন এক নিবেদিত শিক্ষক। তাঁর শিক্ষকতা ও গবেষণার মাধ্যমে তিনি বিপুল জ্ঞান অর্জন করেন এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৫–১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন এবং ১৯৭৫–১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন আধুনিকীকরণ, শিক্ষাপ্রকল্পের পরিকল্পনা এবং গবেষণা কার্যক্রমকে উৎসাহিত করেন।

অধ্যাপক শামসুল হক কেবল বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হনলুলুর ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের স্কলার ইন-রেসিডেন্স প্রজেক্টে ফেলো হিসেবে (১৯৬৪–৬৫) কাজ করেছেন। এছাড়া, উডরো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস, Smithsonian Institution, ওয়াশিংটন ডিসি (১৯৭১–৭৩)-এ ফেলো হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

তিনি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৭৫–৭৭ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল কারিকুলাম কমিটি-এর চেয়ারম্যান, ১৯৭৭–৮২ সাল পর্যন্ত সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিল, প্ল্যানিং কমিটি-এর চেয়ারম্যান এবং ১৯৭৭–৮৩ সাল পর্যন্ত ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর রিসার্চ অন হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট-এর দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ১৯৭০ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর সাধারণ সভায় ইন্টারন্যাশনাল এক্সপার্টস কমিটির সদস্য এবং ১৯৬২ সালে নিউ দিল্লীতে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন অব কমনওয়েলথ এডুকেশন কনফারেন্সের চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

শামসুল হক শিক্ষার সঙ্গে কূটনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৬৮ সালে তিনি পাকিস্তান দলের নেতা হিসেবে লাগোসে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ শিক্ষা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ইকোসকোর ২৫তম বার্ষিকী এবং প্যারিসে ইউনেস্কোর সাধারণ সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৯–৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও কারিগরী বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন এবং ১৯৭৭–৭৮ সালে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, ১৯৭৮–৮২ পর্যন্ত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শুধু কূটনীতি নয়, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন। ১৯৭৯–৮০ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য পদে প্রতিনিধিত্ব করেছে। ১৯৭৮ সালে বার্মার উদ্ধার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন এবং দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা পরিষদ সার্ক-এর প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

অধ্যাপক শামসুল হক দেশের শিক্ষা ও গবেষণাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রেও অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ছিলেন ফাউন্ডেশন ফর রিসার্চ অন এডুকেশন, প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্টের প্রেসিডেন্ট (১৯৭৩), ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব সোশ্যাল সায়েন্স বাংলাদেশ (১৯৮৫–৮৬)-এর প্রেসিডেন্ট এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল মিউজিয়াম ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বোর্ড অব গভর্নরস-এর চেয়ারম্যান।

শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অসীম। অধ্যাপক শামসুল হকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:

  • Changing Education in England (1948)
  • Compulsory Education in Pakistan (1954)
  • Education and Development Strategy in South and South East Asia (1965)
  • Pakistan’s New Education Policy (1970)
  • Education, Manpower and Development in South and South East Asia (1975)
  • The Patterns of Education in South and South East Asia (Encyclopaedia Britannica)
  • Education in German Encyclopaedia

শিক্ষা ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ১৯৮১ সালের নভেম্বর মাসে তাঁকে ‘জাতীয় অধ্যাপক’ পদে নিযুক্ত করে, যা তাঁকে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

অধ্যাপক শামসুল হক ছিলেন একাধারে শিক্ষক, প্রশাসক, গবেষক ও কূটনীতিক। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে, নিবেদিত চেষ্টার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি শুধু নিজের দেশ নয়, আন্তর্জাতিক স্তরে দেশের সুনাম ও শিক্ষার মানোন্নয়নে অবদান রাখতে পারেন। তাঁর শিক্ষাদান, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের জন্য চিরকালীন প্রেরণার উৎস।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window