অধ্যাপক হাবিবুর রহমান ১৯২৩ সালে রামগঞ্জ উপজেলার কালিয়াধারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জানা যায় না, তবে তাঁর পরিবার ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার প্রতি গভীর মনোযোগী ছিল। হাবিবুর রহমান ছিলেন মেধাবী ও উদ্যমী ছাত্র। স্থানীয় দত্তপাড়া স্কুল থেকে স্বর্ণপদকসহ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো তাঁর অসাধারণ শিক্ষাগত প্রতিভা প্রমাণ করেন।
তার পরবর্তী শিক্ষাজীবন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে চলে আসে। সেখানে তিনি আই.এস.সি. পরীক্ষায় আবারও স্বর্ণপদক পান এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি একই কলেজ থেকে বি.এস.সি. (অনার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। হাবিবুর রহমানের শিক্ষাজীবন আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রসারিত হয় যখন তিনি আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত শাস্ত্রে এম.এস.সি. ডিগ্রি অর্জন করেন এবং আবারও স্বর্ণপদক লাভ করেন। শিক্ষা ও গণিত জগতে তার সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে যখন তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এস.সি. ডিগ্রি অর্জন করেন।
অধ্যাপক হাবিবুর রহমান কেবল গণিতের জটিল সূত্র ও তত্ত্বে পারদর্শী ছিলেন না, বরং তাঁর প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক সচেতনতা এবং রাজনীতির প্রতি গভীর আগ্রহ তাঁকে বিশেষ অবস্থান দিয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন শিক্ষাবিদ কেবল পাঠদান ও গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবেন না; সমাজ, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তার অবদান অপরিহার্য।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা, সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সার্বিক কল্যাণ—এই বিষয়গুলো ছিলেন তাঁর জীবনের মূল নীতি। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে সমাজের সার্বিক উন্নয়ন ছাড়া দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি সম্ভব নয়। এ কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর কর্মকাণ্ড সবসময় নৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের কর্মজীবনের সূচনা হয় সরকারি স্কুলগুলিতে শিক্ষকতা দিয়ে। প্রায় ১৭ বছর তিনি বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এই সময়ে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুধু জ্ঞান নয়, মানবিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার চেতনা সৃষ্টি করতেন। ১৯৬৮ সালের ১১ই জানুয়ারি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ দেন। এখান থেকেই তাঁর উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার শুরু হয়।
ড. হাবিবুর রহমান ছিলেন একজন খ্যাতনামা পাঠ্যপুস্তক প্রণেতা। তিনি স্কুল টেক্সট বুক বোর্ডের অনুমোদিত বহু ইংরেজি, বাংলা ও ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছেন। শিক্ষার পাশাপাশি তিনি মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার অধিকারী ছিলেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার বিকাশের জন্য তিনি সবসময় উৎসাহিত করতেন।
১৯৭১ সালের মার্চে, যখন স্বাধীনতার দাবিতে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়, অধ্যাপক হাবিবুর রহমান চুপ করে বসে থাকেননি। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাণ তহবিলের আয়োজন ও আহতদের সাহায্যের জন্য অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। এই সময়ে অবাঙ্গালী ও পাকিস্তানপন্থী শিক্ষকদের কাছে তিনি পাকিস্তানের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হন।
ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে ১৯৭১ সালের ১৪ই এপ্রিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অধ্যাপক হাবিবুর রহমানকে তাঁর বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং গুলি করে হত্যা করে। এভাবে তিনি স্বাধীনতার সংগ্রামে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে জাতি একটি প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও অসাম্প্রদায়িক চিন্তাবিদকে হারায়।
অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের অবদান শুধুমাত্র গণিত বা শিক্ষা ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি সমাজ ও রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। গণিতের মতো কঠিন বিষয়ের শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি তিনি দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমাজের শিক্ষা, নৈতিকতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
ড. হাবিবুর রহমানের জীবন ও ত্যাগ পরবর্তীতে যথাযথ স্বীকৃতি পায়। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ ও ‘একুশে পদক’ প্রদান করে। এই স্বীকৃতি শুধু তাঁর শিক্ষাজীবনের নয়, বরং দেশের জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবেও গণ্য।
আজও অধ্যাপক হাবিবুর রহমানের আদর্শ ও জীবনযাপন শিক্ষার্থী, গবেষক এবং সমাজসেবীদের জন্য প্রেরণার উৎস। তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে একজন শিক্ষাবিদ শুধু পাঠদানই নয়, দেশের সাংস্কৃতিক মর্যাদা, নৈতিকতা ও সামাজিক কল্যাণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। তাঁর জীবন শিক্ষা, নৈতিকতা এবং দেশপ্রেমের এক অনন্য মিলনস্থল।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ৮, ২০২৫