বাংলাদেশের নাট্যসংস্কৃতিতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যারা শুধু মঞ্চে নয়, শিল্পের বিভিন্ন স্তরে অবদান রেখে দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন আতাউর রহমান— নাট্যকার, পরিচালক, মঞ্চাভিনেতা ও থিয়েটারের অগ্রদূত। তিনি কেবল নাট্যজগতের একজন পণ্ডিত নন, বরং বাংলাদেশে আধুনিক নাট্য আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের সংস্কৃতি উপস্থাপনার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর।

আতাউর রহমান ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মরহুম এ. ই. ডিগ্রী মাহবুবার রহমান, এবং পরিবারিক নিবাস বেগমগঞ্জ উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামে।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক মননসম্পন্ন। শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি পরিবারের উৎসাহ তাঁকে শৈশব থেকেই গড়ে তুলেছিল এক বিচক্ষণ মননশীল হিসেবে।

পরবর্তী সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এস.সি. ডিগ্রী লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি নাট্যকলার প্রতি তাঁর আগ্রহ দৃঢ়ভাবে গড়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নাটক, সাহিত্য ও সমসাময়িক সমাজচর্চার সঙ্গে তিনি নিবিড়ভাবে যুক্ত হন।

১৯৬৮ সালে, বাংলাদেশের নাট্যচর্চার জন্য একটি মাইলফলক রচনা করেন আতাউর রহমান। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নাগরিক নাট্যদল, যা দেশের অন্যতম প্রধান নাট্যদল হিসেবে স্বীকৃত।
প্রতিষ্ঠা পর থেকে তিনি দলের সম্পাদক, মঞ্চাভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর নেতৃত্বে নাগরিক নাট্যদল দেশের নাট্যকলাকে নতুন দিশা দেখিয়েছে।

তিনি কেবল পরিচালনা ও মঞ্চনাট্য নয়, বরং বেতার ও টিভি নাটকের অভিনয় ক্ষেত্রেও সক্রিয়। তাঁর অভিনয় ও নির্দেশনশৈলী দর্শক ও সমালোচকদের কাছেও সমানভাবে প্রশংসিত।
নাট্যকলার মাধ্যমে তিনি সমাজ ও মানুষের মানসিকতা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের নানা দিক দর্শকদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

আতাউর রহমানের প্রকাশিত গ্রন্থগুলোতে তার নাট্যদৃষ্টিকোণ ও সাহিত্যচেতনার প্রকাশ পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো—

  • “প্রজাপতি নির্বন্ধ” (মূল: নিকোলাই গোগোলের The Marriage)
    এই নাটক আধুনিকীকৃত অনুবাদ ও নাট্যরূপায়ণ হিসেবে সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেছে।

  • “দ্বার রুদ্ধ” (মূল: জি. পল সাত্রের No Exit)
    সমাজ, মানসিক দ্বন্দ্ব ও মানুষের সম্পর্কের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ এই নাটকে প্রতিফলিত।
    উভয় গ্রন্থই নাট্যকলার দর্শন ও আধুনিক নাট্যচর্চার সংমিশ্রণ হিসেবে সমাদৃত।

নাট্যাভিনয় ও নির্দেশনায় আতাউর রহমান দেশের বাইরে বিভিন্ন সফর করেছেন। তিনি এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে নাট্যাভিনয় প্রদর্শন করেছেন। এই আন্তর্জাতিক সফর তাঁর দক্ষতা ও দেশের নাট্যকলাকে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

নাট্যজগতে তাঁর ব্যস্ততার পাশাপাশি আতাউর রহমান ব্যক্তিগত জীবনে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও সক্রিয়। তিনি বিজয় টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিজ লিঃ এর অংশীদার (পরিচালক) এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান।
ব্যবসা, নাট্যচর্চা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ড— এই তিনটি ক্ষেত্রেই তিনি দক্ষ ও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছেন।

আতাউর রহমান বর্তমানে—

  • বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের চেয়ারম্যান,

  • ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের কোষাধ্যক্ষ,
    এরূপ দায়িত্ব পালন করছেন।

এটি প্রমাণ করে যে তিনি কেবল নাট্যকার বা পরিচালক নন, বরং দেশের সামগ্রিক নাট্যসংস্কৃতির নেতৃত্বের অন্যতম স্তম্ভ। তাঁর নেতৃত্বে বিভিন্ন নাট্যদল, থিয়েটার ফেডারেশন ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি গড়ে উঠেছে।

আতাউর রহমান ছিলেন সৃজনশীল, নিবেদিত ও দূরদর্শী। তিনি বিশ্বাস করেন— নাট্যকলা কেবল বিনোদন নয়, বরং সমাজচেতনা, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও মানবিক সচেতনতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
তার নির্দেশনায় নাটকগুলো সমাজের বাস্তব চিত্র, মানুষের মানসিকতা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে।

আতাউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের নাট্যজগতের এক প্রজ্ঞাবান পথপ্রদর্শক। নাট্যকার, নির্দেশক, মঞ্চাভিনেতা এবং থিয়েটার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি বাংলাদেশের নাট্যসংস্কৃতিতে অমোঘ ছাপ রেখেছেন।
নাগরিক নাট্যদলের প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক নাট্যসফর, প্রকাশিত নাট্যগ্রন্থ এবং সাংগঠনিক নেতৃত্ব— সব মিলিয়ে আতাউর রহমান আজও বাংলাদেশের নাট্যজগতে এক অমর প্রতীক।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window