১৮৮১ সালে নোয়াখালী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন জনাব আবদুর রশিদ খান। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং ধীরে ধীরে শিক্ষাজীবনে অসামান্য কৃতিত্ব অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি আইন ব্যবসায় যুক্ত হন এবং ১৯০৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আইন পেশা শুরু করেন। মাত্র এক বছরের মধ্যেই স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ১৯০৬ সালে নোয়াখালী পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এটি ছিল তাঁর সামাজিক নেতৃত্বের প্রথম বড় সাফল্য।

পরবর্তী সময়ে তিনি দ্রুত রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ করেন। ১৯১৩ সালে জেলা বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯১৫-১৬ সালে জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। ঐ বছরই তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে “খান সাহেব” উপাধি লাভ করেন। তবে তাঁর প্রকৃত পরিচয় শুধু একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সমাজসংস্কারক ও দূরদর্শী অর্থনৈতিক চিন্তাবিদ। তাঁর উদ্যোগে পূর্ববঙ্গ জুড়ে সমবায় আন্দোলন শুরু হয় এবং নোয়াখালীতে প্রথমবারের মতো একটি কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। কৃষক ও সাধারণ মানুষের আর্থিক মুক্তির স্বপ্নে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান পরবর্তীকালে বৃহত্তর আন্দোলনের বীজ বপন করে।

১৯১৯ সালে হজ্ব পালন শেষে দেশে ফিরে এসে আবদুর রশিদ খান জাতীয় আন্দোলনের সাথে নিজেকে যুক্ত করেন। খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন এবং আইন অমান্য আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তাঁর এই অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে ব্রিটিশ সরকার কারারুদ্ধ করে। তবে তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আরও দৃঢ় প্রত্যয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

১৯২১ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি ব্রিটিশ কুশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন বর্জন করেন। শুধু তাই নয়, তিনি এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন—ধোপা, নাপিত, মুচি কিংবা সাধারণ চায়ের দোকানদারকে প্রার্থী ঘোষণা করে মূলত ব্রিটিশ সমর্থিত অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে গণমানুষের শক্তি প্রদর্শন করেন। নির্বাচনে এসব প্রার্থীরা কোনো অর্থ ব্যয় না করলেও, প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ বিপুল অর্থ ব্যয় করে এবং অনেকের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এই ঘটনা রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির হয়ে থাকে।

১৯২০ সালে যখন ব্রিটিশ সরকার তুরস্কে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছিল, তখন প্রতিবাদস্বরূপ আবদুর রশিদ খান প্রথম নোয়াখালীতে নিজের প্রাপ্ত “খান সাহেব” খেতাব ত্যাগ করেন। এটি ছিল ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিরোধের প্রতীক। খেলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে নোয়াখালীতে আগমন করেন মওলানা শওকত আলী, মোহাম্মদ আলী এবং সর্বভারতীয় কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ। তাঁরা নোয়াখালীতে খেলাফত আন্দোলনের সাফল্য দেখে মুগ্ধ হন এবং নোয়াখালীবাসীর প্রশংসা করেন।

১৯২২ সালে নোয়াখালী টাউন হলে অনুষ্ঠিত খেলাফত আন্দোলনের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন আবদুর রশিদ খান। এতে যোগ দেন ভারতের খ্যাতনামা নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তাঁর নেতৃত্ব ও সংগঠক দক্ষতা সেই সময়ের জাতীয় আন্দোলনে বিশেষ মাত্রা যোগ করে।

জাতীয় রাজনীতির মূলধারায় আবদুর রশিদ খানের ভূমিকা এখানেই শেষ হয়নি। ১৯২২ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে গঠিত স্বরাজ পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি ওই পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এই দায়িত্ব পালনের সময় তিনি স্বরাজ অর্জনের জন্য জনগণকে সংগঠিত করেন এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে বিশেষ অবদান রাখেন।

১৯২৫ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের দ্বিতীয় একজিকিউটিভ অফিসার পদে এবং ১৯২৮ সালে ডেপুটি একজিকিউটিভ অফিসার পদে নিযুক্ত হন। কলকাতার মতো মহানগরে দায়িত্ব পালন করা ছিল তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবনের বড় অর্জন। সেখানে কাজ করার সময়ও তিনি গণমানুষের কল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন।

আবদুর রশিদ খান ছিলেন একদিকে দূরদর্শী সমাজসংস্কারক, অন্যদিকে সাহসী রাজনৈতিক নেতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাধারণ মানুষকে সংগঠিত না করলে কোনো আন্দোলন সফল হতে পারে না। তাঁর উদ্যোগেই সমাজের প্রান্তিক মানুষ রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। খেলাফত আন্দোলনে যেমন তিনি সাধারণ মানুষকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তেমনি সমবায় আন্দোলনের মাধ্যমে কৃষক ও নিম্নবিত্ত শ্রেণিকে আর্থিকভাবে সচল করার পথ দেখিয়েছিলেন।

তাঁর জীবন সংগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া উপাধি বর্জন। অনেক সময় উপাধি বা খেতাব ছিল শাসকদের পক্ষ থেকে আনুগত্য আদায়ের হাতিয়ার। কিন্তু আবদুর রশিদ খান তা প্রত্যাখ্যান করে প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রকৃত সম্মান অর্জিত হয় জনগণের ভালোবাসা ও আস্থার মধ্য দিয়ে।

আবদুর রশিদ খান দীর্ঘ কর্মময় জীবন অতিবাহিত করে ১৯৭০ সালে ইন্তেকাল করেন। প্রায় নয় দশকব্যাপী জীবনের বড় একটি অংশ তিনি জনগণের সেবায়, সমাজ সংস্কারে এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে নোয়াখালী তথা সমগ্র বাংলার মানুষ একজন নির্ভীক রাজনীতিক ও মানবপ্রেমী সমাজসেবককে হারায়।

 

 

 

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window