বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও কূটনৈতিক পরিসরে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের কর্মজীবন শুধু সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং দেশের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব ও প্রেস ব্যবস্থার উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবদুর রহিম, যিনি একাধারে সাংবাদিক, প্রশিক্ষক, প্রেস কাউন্সিলের সদস্য এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি।

আবদুর রহিম জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালে নোয়াখালী সদর উপজেলায়। তিনি ছিলেন পিতা আলহাজ্ব আবদুস সোবহানের কনিষ্ঠ সন্তান। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন জ্ঞান-পিপাসু ও কৌতূহলপূর্ণ। পরিবারের শিক্ষানুরাগী পরিবেশ তাকে শিক্ষার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছিল। ছাত্রজীবনে তিনি ইতিহাসে বিশেষ আগ্রহী হয়ে ওঠেন, যা পরবর্তীতে তাঁর সাংবাদিকতা ও গবেষণামূলক কাজের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

আবদুর রহিম শিক্ষাজীবনে ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। তিনি ১৯৫৬ সালে ইতিহাসে সম্মানসহ বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৫৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবনের এই সাফল্য তাঁকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দৃঢ় ও সমাজ সচেতন করে তোলে।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি দৈনিক মিল্লাত-এ সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। শুরুর দিনগুলোতে সংবাদ সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও লেখা-লিখির কাজের মাধ্যমে তিনি সাংবাদিকতার নীতিমালা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে তিনি যোগদান করেন দৈনিক বাংলাদেশ অবজারভারে, যেখানে তাঁর প্রাঞ্জল লেখা, বিচক্ষণ বিশ্লেষণ এবং সংবাদ পরিবেশনের নৈপুণ্য পাঠক ও সহকর্মীদের মধ্যে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।

আবদুর রহিম শুধু সাংবাদিক হিসেবেই সক্রিয় ছিলেন না; তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন, যা তাঁর দেশপ্রেম ও সামাজিক সচেতনতার প্রমাণ। তিনি সেই সময় বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং জনগণের সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার জন্য সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া তাঁর ব্যক্তিত্বকে আরও দৃঢ়তা ও নৈতিকতার সঙ্গে প্রজ্জ্বলিত করে।

তৎকালীন প্রতিযোগিতামূলক সরকারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি, বরং সাংবাদিকতা এবং দেশের সংবাদ মাধ্যম ও প্রেস ব্যবস্থার উন্নয়নে নিবেদিত থাকেন। দেশের স্বাধীনতার পর নবগঠিত বাংলাদেশ ফেডারেশন অফ ইউনিয়ন অব জার্নালিস্টস (BFUJ)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রেস ইনস্টিটিউটের প্রশিক্ষক এবং প্রেস কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খন্ডকালীন প্রভাষক হিসেবেও শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন।

আবদুর রহিমের দক্ষতা শুধু দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি পদগুলো ছিল—

  • ১৯৭৬: তুরস্কে সপ্তম ইসলামিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন

  • ১৯৮০: জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল

  • ১৯৮৪: সাংহাইয়ে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রেস ও মিডিয়ার সম্মেলনে প্রতিনিধি

এই পদগুলোতে তিনি বাংলাদেশের সংবাদ ও মিডিয়া সংক্রান্ত নীতি, কূটনৈতিক ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক সমঝোতা উন্নয়নে অবদান রেখেছেন।

১৯৮৭ সালে আবদুর রহিম ব্রিটেনে বাংলাদেশের মিশনে প্রেস মিনিস্টার হিসেবে নিযুক্ত হন। এই পদে তিনি বাংলাদেশি মিডিয়ার ভাবমূর্তি গঠন, প্রবাসী সাংবাদিকদের সমন্বয় এবং দেশের কূটনৈতিক কার্যক্রম প্রচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি উক্ত পদে বহাল আছেন।

এর আগে তিনি বাংলাদেশ অবজারভার-এর নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। এই সময়ে তাঁর নেতৃত্বে পত্রিকাটি সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলোর বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিল।

আবদুর রহিম ছিলেন দক্ষ সাংবাদিক, বিচক্ষণ বিশ্লেষক এবং নীতিনিষ্ঠ কূটনীতিক। তাঁর লেখা ও উপস্থাপনা ছিল সমসাময়িক তথ্যের নির্ভুল, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণধর্মী। তিনি বিশ্বাস করতেন সংবাদ মাধ্যম শুধু খবরের যোগান নয়, বরং সমাজ সচেতনতা, নৈতিকতা এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তার আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সময় তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে একজন সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা কেবল পত্রিকা নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

আবদুর রহিম বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এবং প্রেস ব্যবস্থায় যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। তিনি শুধু সংবাদ পরিবেশক নন, বরং প্রশিক্ষক ও শিক্ষকের ভূমিকায়ও বহু তরুণ সাংবাদিককে পথ দেখিয়েছেন। দেশের স্বাধীনতা, ভাষা আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ তাকে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক ইতিহাসে এক উজ্জ্বল চরিত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window