বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁরা ভাষার সীমানা অতিক্রম করে চিন্তা, সংস্কৃতি ও দর্শনের সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন আবদুল্লাহ মোহাম্মদ—একজন বহুভাষিক সাহিত্যিক, যিনি বাংলা, উর্দু ও ইংরেজি—এই তিন ভাষাতেই সমান দক্ষতায় লিখে গেছেন। তাঁর রচনায় যেমন ছিল ইসলামী চিন্তা ও ঐতিহ্যের অনুসন্ধান, তেমনি ছিল সাহিত্য ও মানবিকতার গভীর ব্যাখ্যা।

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩২ সালের ১লা এপ্রিল, নোয়াখালীর ভাঙ্গাখা গ্রামে। গ্রামীণ, অথচ শিক্ষাপ্রিয় পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর শৈশব কেটেছিল জ্ঞান ও সংস্কৃতির আবহে। তাঁর পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি সাহিত্যপ্রীতিও ছিল প্রবল। ছোটবেলা থেকেই তিনি পাঠাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন—কবিতা, ধর্মগ্রন্থ ও ইতিহাস ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।

নোয়াখালীর মতো ঐতিহ্যবাহী জনপদে বেড়ে ওঠার ফলে তিনি সমাজ, ধর্ম ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাঁর লেখার ভেতর জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছে পরবর্তী সময়ে।

ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। বাংলা ভাষার পাশাপাশি উর্দু ও ইংরেজিতেও গভীর দক্ষতা অর্জন করেন। এই তিন ভাষার সাহিত্য তিনি মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করেন এবং নিজেকে বহুভাষিক চিন্তার ধারায় গড়ে তোলেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের সাফল্য পরবর্তী সাহিত্যজীবনের ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

উর্দু ও ফারসির প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল বিশেষ। মুসলিম সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের সঙ্গে এই দুই ভাষার গভীর সম্পর্ক রয়েছে—তাই আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সেই ঐতিহ্যের আলোকে ইসলামী সাহিত্য ও চিন্তাকে বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন।

তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু হয় মূলত ইসলামি দর্শন, ইতিহাস ও সাহিত্য আন্দোলনের প্রতি আগ্রহ থেকে। তিনি এমন সময়ে লিখছিলেন, যখন উপমহাদেশে মুসলিম চেতনা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার স্রোত বইছিল।
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সেই প্রেক্ষাপটে মুসলিম সমাজের ইতিহাস ও সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের পুনঃমূল্যায়ন করেন—তাঁর লেখাগুলো তাই কেবল তথ্যনির্ভর নয়, বরং দার্শনিক ও বিশ্লেষণধর্মী।

বাংলা ভাষায় তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি বই সাহিত্যপাঠকদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

  • ‘ইসলামী দর্শন’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড)

  • ‘মুসলিম জাগরণে কয়েকজন কবি সাহিত্যিক’

  • ‘পূর্ব বঙ্গে ফারসি সাহিত্য’

এই দুই খণ্ডে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ইসলামী চিন্তার মৌল কাঠামো, নৈতিক দর্শন, মানবতাবোধ ও সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। তিনি ইসলামকে কেবল ধর্ম হিসেবে নয়, এক জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বিশ্লেষণ স্পষ্ট, যুক্তিনির্ভর ও পাঠযোগ্য—যা একাডেমিক ক্ষেত্রেও মূল্যবান অবদান হিসেবে গণ্য হয়।

এই গ্রন্থে তিনি উনিশ শতক ও বিশ শতকের মুসলিম সাহিত্যিকদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছেন—যাঁরা মুসলিম সমাজে আত্মচেতনা ও জাগরণের বীজ বপন করেছিলেন। আল্লামা ইকবাল, স্যার সৈয়দ আহমদ, হালি প্রমুখ চিন্তাবিদের সাহিত্যকর্ম তিনি বিশ্লেষণ করেছেন ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে।

এই বইয়ে তিনি ফারসি ভাষা ও সাহিত্য কীভাবে বাংলার মুসলিম সমাজে প্রভাব ফেলেছিল, তা তুলে ধরেছেন। মধ্যযুগীয় বাংলায় ফারসি সাহিত্যিক ঐতিহ্য, অনুবাদ সাহিত্য এবং প্রশাসনিক ভাষা হিসেবে ফারসির গুরুত্ব—সবই তাঁর গবেষণায় উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

উর্দু ভাষার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রমাণ মেলে তাঁর কয়েকটি অনুবাদ ও গবেষণামূলক কাজে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাঁর অনূদিত গ্রন্থগুলো—

  • ‘হালির হায়াতে সাবেদ’

  • ‘মুসাদ্দাসে হালি’

  • ‘স্যার সৈয়দ আহমদ এর ভারতে বিদ্রোহের কারণ’ (উর্দু থেকে বঙ্গানুবাদ)

এটি ছিল উর্দু সাহিত্যের এক বিখ্যাত কবিতা, যা মুসলিম সমাজের পতন, আত্মসমালোচনা ও পুনর্জাগরণের বার্তা বহন করে। আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এই রচনাকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেন। তাঁর অনুবাদে শুধু ভাষার সৌন্দর্য নয়, মূল ভাবের গভীরতাও অক্ষুণ্ণ থেকেছে।

এই অনুবাদমূলক কাজটি ছিল গবেষণার অংশও বটে। তিনি স্যার সৈয়দের রাজনৈতিক চিন্তা, সমাজসংস্কার ও শিক্ষানীতির বিশ্লেষণ করেছেন অনন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে। অনুবাদের সঙ্গে তাঁর ব্যাখ্যামূলক টীকা বইটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

বাংলা ও উর্দুর পাশাপাশি তিনি ইংরেজিতেও দক্ষ ছিলেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য ইংরেজি গ্রন্থ হলো—

  • ‘Some Muslim Stall Words’

এই গ্রন্থে তিনি মুসলিম সমাজ ও চিন্তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা, তাদের উৎস, দর্শন ও আধুনিক প্রয়োগ ব্যাখ্যা করেছেন। এতে তাঁর আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বহুভাষিক সাহিত্যবোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আবদুল্লাহ মোহাম্মদের লেখায় ধর্ম, সাহিত্য ও সমাজ—এই তিনটির এক গভীর সমন্বয় দেখা যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য হলো মানুষের আত্মার প্রতিফলন, আর ধর্ম সেই আত্মাকে আলোকিত করে। তাই তাঁর রচনায় নৈতিকতা, সত্য, জ্ঞান ও মানবতার বার্তা সবসময় কেন্দ্রস্থলে ছিল।

তিনি ছিলেন গবেষণামুখী লেখক। প্রতিটি রচনায় সূত্র, দলিল ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের প্রতি তাঁর গভীর সচেতনতা প্রকাশ পায়। তবু তাঁর ভাষা কখনো একঘেয়ে নয়—পাঠযোগ্য ও ভাবনাপ্রবণ।

আবদুল্লাহ মোহাম্মদের সাহিত্যকর্ম তিনটি ভাষার সেতুবন্ধন তৈরি করেছে—বাংলা, উর্দু ও ইংরেজি। এই তিন ভাষায় সমান দক্ষতা অর্জন করা লেখক খুব কমই দেখা যায়। তাঁর রচনা মুসলিম সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ, সাহিত্যিক ঐতিহ্য ও ভাষাগত বৈচিত্র্যের এক অমূল্য দলিল হয়ে আছে।

আজও যারা ইসলামী সাহিত্য, ফারসি ও উর্দু সাহিত্যচর্চা কিংবা মুসলিম সমাজের জাগরণ নিয়ে গবেষণা করেন, তাঁদের জন্য আবদুল্লাহ মোহাম্মদের কাজ এক অপরিহার্য সূত্র হিসেবে গণ্য হয়।

আবদুল্লাহ মোহাম্মদ ছিলেন এক বহুমাত্রিক প্রতিভা—গবেষক, লেখক, অনুবাদক ও চিন্তাবিদ। তাঁর লেখায় ধর্মীয় অনুপ্রেরণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাসের বিশ্লেষণ ও মানবিকতার বোধ। নোয়াখালীর এক ছোট গ্রাম থেকে উঠে এসে তিনি বাংলা, উর্দু ও ইংরেজি—এই তিন ভাষায় যে সাহিত্যিক দিগন্ত তৈরি করেছেন, তা তাঁকে এক অনন্য স্থানে স্থাপন করে।

তাঁর সাহিত্যকর্ম আমাদের শেখায়, ভাষা ও সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও চিন্তার আলো এক—যে আলো জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবতার পথ দেখায়।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window