নোয়াখালী অঞ্চলের ইতিহাস ও সমাজে কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং সমাজ ও দেশের কল্যাণে অবদানের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এমন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেন আবদুল মান্নান মোহাম্মদ, যিনি ব্যবসায়িক, সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান দিয়ে নোয়াখালীর মানুষের কাছে এক অনন্য স্থান গড়ে তুলেছেন।
আবদুল মান্নান মোহাম্মদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪২ সালে নোয়াখালী সদর উপজেলার পশ্চিম চর উরিয়া (ইসহাকপুর) গ্রামে। তাঁর পিতা, মরহুম ইসহাক মিয়া, একজন সমাজসেবী ও দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে জনাব মান্নান নোয়াখালী জেলা স্কুল এবং পরে ফেনী কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন।
শৈশবকাল থেকে তাঁর মধ্যে নেতৃত্ব, সামাজিক দায়িত্ব ও প্রগাঢ় মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। প্রাথমিক শিক্ষা ও পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমে তিনি মানবসেবার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন।
শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং মেধা, দক্ষতা ও নেতৃত্বের পরিচয় দিয়ে একজন মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সেনাজীবন তাঁকে সংগঠিত, ন্যায়পরায়ণ এবং দৃঢ়চেতা ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছিল, যা পরবর্তীতে ব্যবসা ও সমাজসেবায় কাজে আসে।
স্বাধীনতার পর জনাব মান্নান ব্যবসায়ে মনোনিবেশ করেন। তাঁর উদ্যোগের পরিধি ছিল বিস্তৃত। তিনি আমদানী-রপ্তানি, মৎস্য চাষ, পরিবহন, ইন্ডেন্টিং, ক্লিয়ারিং ও ফরওয়ার্ডিং, রবারচাষ, চা রপ্তানি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও কনসালট্যান্টিং—সহ বহু খাতে সক্রিয় ছিলেন।
তিনি ১৬টি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর স্বত্বাধিকারী, ইষ্টান ইন্সুরেন্স কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান ও ডাইরেক্টর, এবং সনেম্যান গ্রুপ অব কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি তিনি সর্বদা সমাজ ও দেশের কল্যাণে মনোযোগী ছিলেন।
আবদুল মান্নান মোহাম্মদের শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি নোয়াখালীতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় জড়িত ছিলেন। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে রয়েছে:
-
মেজর মান্নান ফাউন্ডেশন
-
মেজর মান্নান ট্রাস্ট
-
ইসহাকপুর মেজর মান্নান হাইস্কুল
-
নোয়াখালী আইন কলেজ
-
চাঁদের হাট আবদুল মালেক কলেজ
-
খলিফার হাট হামিদিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা
-
চর কোলাকোপা কারামতিয়া আলিয়া মাদ্রাসা
-
মরমটয়া মাদ্রাসা
এছাড়া তিনি শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের মাধ্যমে নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
আবদুল মান্নান মোহাম্মদ ছিলেন একজন দূরদর্শী, উদার ও নৈতিক নেতা। ব্যবসায়িক চাপে থাকলেও তিনি সমাজসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রে তার দায়িত্ব কখনও উপেক্ষা করেননি। তাঁর জীবনপ্রতিষ্ঠা করে যে শিক্ষা তা হলো—ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জনের পাশাপাশি সমাজের কল্যাণে অবদান রাখা সম্ভব।
তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে প্রেরণার এক জীবন্ত প্রতীক, যিনি দেখিয়েছেন যে ধন, সম্পদ ও ক্ষমতা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জন্য নয়, বরং সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করা সম্ভব।
আবদুল মান্নান মোহাম্মদ শুধুমাত্র ব্যবসায়ী নন; তিনি শিক্ষক, সমাজসেবক, উদার ব্যক্তি এবং নৈতিক আদর্শের প্রতীক। নোয়াখালীর মানুষ এবং বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্র ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও আলোচিত। মেজর মান্নান ফাউন্ডেশন ও ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি সমাজে শিক্ষা, দান ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
তার জীবন প্রমাণ করে, সফলতা মানেই শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং সমাজ ও মানুষের কল্যাণেও তা ব্যবহৃত হওয়া উচিত।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ২৮, ২০২৫