বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পোন্নয়ন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে কয়েকজন ব্যক্তি বহুমুখী প্রভাব রেখেছেন, আব্দুল আউয়াল মিন্টু তাদের অন্যতম। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া মিন্টু বাংলাদেশের বাণিজ্য জগতের একজন অত্যন্ত সুপরিচিত উদ্যোক্তা এবং একই সঙ্গে জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বই দেননি, বরং ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ প্রতিনিধি সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সভাপতি হিসেবেও দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পাশাপাশি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিজস্ব অবস্থান ও প্রভাব ধরে রেখেছেন।
আব্দুল আউয়াল মিন্টুর শৈশব কেটেছে ফেনী জেলার আলেয়ারপুর নামের এক গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনায় আগ্রহী ছিলেন এবং বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফেনী গভর্নমেন্ট পাইলট হাই স্কুল থেকে ১৯৬৪ সালে তিনি এসএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা করেন এবং ১৯৬৬ সালে এইচএসসি পাস করেন।
শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ তাঁকে দেশের সীমা পেরিয়ে নিয়ে যায়। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামের মেরিন একাডেমি (তৎকালীন পাকিস্তান মেরিন একাডেমি) থেকে নটিক্যাল সায়েন্সে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। মেরিন সেক্টর নিয়ে গভীরভাবে জানার আগ্রহ থেকেই ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিতে যান। ১৯৭৩ সালে স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক মেরিটাইম কলেজ থেকে মেরিন ট্রান্সপোর্টেশন সায়েন্সে বি.এসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে পরিবহন ব্যবস্থাপনা, অ্যাডভান্স চার্টারিং ও আরবিট্রেশনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে তিনি একাধারে আন্তর্জাতিক মানের নৌ-পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বাণিজ্য ব্যবস্থাপনায় দক্ষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলেন।
আব্দুল আউয়াল মিন্টুর পেশাগত জীবন বিস্ময়করভাবে বহুমুখী। বাংলাদেশের বাণিজ্য খাত, ব্যাংকিং, বীমা, কৃষি, জাহাজ মালিকানা, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, শিল্প উদ্যোক্তা–এসব প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় ও শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে।
তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশের বৃহত্তম বেসরকারি সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশের বাজারে জনসন অ্যান্ড জনসনের একমাত্র ডিস্ট্রিবিউশন ও মার্কেটিং অপারেশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শিল্পখাতে তাঁর অবদান এর চেয়েও বিস্তৃত। চট্টগ্রাম সিমেন্ট ক্লিংকার গ্রাইন্ডিং কোম্পানি লিমিটেড (হাইডেলবার্গ সিমেন্ট)-এর পরিচালক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি দুলামিয়া কটন স্পিনিং মিলস লিমিটেডের উপদেষ্টা ছিলেন। কৃষিভিত্তিক শিল্পে তাঁর আগ্রহ তাঁকে অপু ও হাইব্রিড সবজি বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ ও গবেষণা খাতে গভীরভাবে যুক্ত করেছে। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ সিড মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ সিড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।
বাংলাদেশের ব্যাংকার, উদ্যোক্তা, শিপিং মালিক, টেক্সটাইল উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন শিল্প খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত অসংখ্য সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ে তাঁর নেতৃত্ব রয়েছে। উল্লেখযোগ্য দায়িত্বগুলোর মধ্যে আছে—
-
বাংলাদেশ ইন্ডিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BICCI)–এর চেয়ারম্যান
-
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (BAB)–এর নির্বাহী কমিটির সদস্য
-
বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট (১৯৯৭–১৯৯৯)
-
বাংলাদেশ ওশান গোয়িং শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান (১৯৮৮–২০০০)
-
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন, বিএমএফএ এবং বিএমএফএ–সহ বিভিন্ন সংগঠনের নির্বাহী সদস্য
-
ইসলামীক শিপওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (জেদ্দা)–এর দীর্ঘমেয়াদি ইসি সদস্য
এছাড়া হোটেল খাতেও তাঁর ব্যবসায়িক উদ্যোগ রয়েছে। তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অ্যাকাডেমি ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের বোর্ড সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ব্যবসায়িক সফলতার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও তাঁর নিবেদন প্রশংসনীয়। তিনি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজ, বদরুন্নেসা হাই স্কুল এবং আলহাজ্ব সাফিউল্লাহ হাই স্কুলসহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তিনি বাংলাদেশ ওপেন ইউনিভার্সিটি এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
২০০৩ সালে তিনি এফবিসিসিআই–এর সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায় প্রশাসন, রপ্তানি উন্নয়ন এবং শিল্পখাতে নীতিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। তিনি ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
একজন সফল উদ্যোক্তা, দক্ষ সংগঠক, শিক্ষানুরাগী এবং রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আব্দুল আউয়াল মিন্টু এখনও বাংলাদেশের ব্যবসা ও রাজনীতির ক্ষেত্রে একটি পরিচিত প্রভাবশালী নাম।
Source : wikipedia
Last modified: নভেম্বর ১৪, ২০২৫