বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি গবেষণার ক্ষেত্রে লোক সাহিত্য বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করে। এই ধারার একজন অম্লান অবদানকারী ছিলেন অধ্যাপক আলী আহমদ। তিনি Dr. দীনেশ চন্দ্র সেন এবং আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের পরেই বাংলার লোক সাহিত্যের গবেষক হিসাবে সুপরিচিতি অর্জন করেন। কলমী পুঁথি সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং গবেষণায় তার বিশেষ অবদান আজও শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
অধ্যাপক আলী আহমদ ১৯১০ সালে লক্ষ্মীপুরের চররচিতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও ইতিহাসের প্রতি তার অনুরাগ গভীর ছিল। তার শিক্ষাজীবনের শুরু কুমিল্লা জেলা স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে হলেও তিনি পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করেন। পরে তিনি ভিক্টোরিয়া কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ১৯৭৪ সাল থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পান্ডুলিপি সংরক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।
অধ্যাপক আলী আহমদের কর্মজীবন শুধু শিক্ষাদানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বাংলা একাডেমীর সংরক্ষিত কলমী পুঁথির অধিকাংশ সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার গবেষণার জন্য তিনি পুঁথি ও ঐতিহাসিক গ্রন্থের বিশ্লেষণে অবিচল উৎসর্গ প্রদর্শন করেছেন। তিনি পুঁথির সঠিক সংরক্ষণ, বর্ণনা এবং গবেষণার মাধ্যমে বাংলার লোক সাহিত্য ও মুসলিম সাহিত্যকেন্দ্রিক তথ্যসমূহ চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছেন।
তার বৈজ্ঞানিক ও সাহিত্যিক অবদানকে স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৫ সালে অধ্যাপক আলী আহমদকে বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এই পুরস্কার তার গবেষণা ও সাহিত্যকর্মের গুরুত্বকে সমর্থন করে।
অধ্যাপক আলী আহমদের গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে—
-
সৈয়দ সুলতান রচিও ওফাতে রসুল
-
দৈলত উজির বাহরাম খানের রচিত ইমাম বিজয়
-
কবি আবদুল হাকিমের নূরনামা
-
প্রাচীন কলমী পুথির বিবরণ
-
বাংলা মুসলিম গ্রন্থ পঞ্জী
এই সব গ্রন্থে তিনি বাংলা মুসলিম সাহিত্য ও ইতিহাসের বিভিন্ন দিককে সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে পুঁথি ও প্রাচীন সাহিত্যকর্মের উপর তার গবেষণা নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় ও মূল্যবান। তার কাজ শুধু গবেষকদের জন্য নয়, ইতিহাসপ্রেমী পাঠক এবং শিক্ষার্থীদের জন্যও এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অধ্যাপক আলী আহমদের গবেষণার ক্ষেত্রে তার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি ছিল—সাহিত্যের সঙ্গে ইতিহাসের সংযোগ স্থাপন। তিনি প্রাচীন কলমী পুঁথি ও মুসলিম সাহিত্যকর্মকে বিশ্লেষণ করার সময় সমাজ, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের দিকে গুরুত্বারোপ করতেন। ফলে তার গবেষণায় শুধু তথ্যের সংরক্ষণ নয়, বরং ঐতিহাসিক ও নৈতিক প্রাসঙ্গিকতাও ফুটে উঠেছে।
তিনি জীবদ্দশায় শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে যে নিবেদিত মনোভাব দেখিয়েছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। অধ্যাপক আলী আহমদের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সাহিত্য গবেষণায় এক সমৃদ্ধ পরিসর তৈরি করেছে। তার গবেষণামূলক গ্রন্থগুলি আজও বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা কেন্দ্র এবং গ্রন্থাগারে গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণকৃত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
অধ্যাপক আলী আহমদের সাহিত্য ও গবেষণার প্রভাব কেবল তার সময়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। আজও তার সংগ্রহকৃত পুঁথি এবং গবেষণামূলক গ্রন্থগুলি নতুন গবেষকদের জন্য শিক্ষার উৎস, যা বাংলা লোক সাহিত্য, মুসলিম সাহিত্য ও প্রাচীন পুঁথি সংরক্ষণে অনন্য দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
অধ্যাপক আলী আহমদ ছিলেন এক উজ্জ্বল সাহিত্য গবেষক এবং শিক্ষাবিদ, যিনি বাংলার লোক সাহিত্য ও মুসলিম সাহিত্য গবেষণার ক্ষেত্রে অম্লান অবদান রেখেছেন। কলমী পুঁথি সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং প্রাচীন সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষণে তার অবদান বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসের গবেষণায় চিরস্মরণীয়। তার গবেষণা ও লেখালেখি আমাদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৯, ২০২৫