আল্লামা লুৎফর রহমান (২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ – ৩ মার্চ ২০২৪) ছিলেন বাংলাদেশের একজন অন্যতম প্রখ্যাত আলেম, গবেষক, ইসলামি বক্তা ও বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরিনের কেন্দ্রীয় সভাপতি। অর্ধশতাব্দীরও অধিক সময় ধরে তিনি ইসলামের দাওয়াত, গবেষণা ও ব্যাখ্যানমূলক আলোচনার মাধ্যমে দেশ–বিদেশে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর বর্ণনামূলক ও প্রজ্ঞাময় ওয়াজ-নসিহত বিশাল সংখ্যক মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ২০২৪ সালের ৩ মার্চ রবিবার দুপুর ২টা ৫৪ মিনিটে তিনি রাজধানীর ইবনে সিনা হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

মুহাম্মদ লুৎফর রহমান ১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার করপাড়া ইউনিয়নের বদরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ। পিতা আলেম ও সমাজসেবী আব্দুস সামাদ এবং মাতা বেগম মাকসুদা খাতুন ছিলেন আদর্শবান পরিবারপ্রধান। ভাই–বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় সন্তান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই পুত্র ও পাঁচ কন্যাসহ একটি সুশিক্ষিত পরিবার রেখে গেছেন।

পিতা আব্দুস সামাদের কাছ থেকেই তাঁর প্রাথমিক ইসলামী শিক্ষার সূচনা। পরবর্তীতে তিনি ধারাবাহিকভাবে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যন্ত সকল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।

  • ১৯৬১ সালে কালাইয়া রব্বানিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল,

  • ১৯৬৩ সালে রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে আলিম,

  • ১৯৬৫ সালে ফাজিল

  • এবং ১৯৬৭ সালে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন।

ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষায়ও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর প্রতিটি পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া এবং স্কলারশিপ অর্জন তাঁকে একজন অসাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও সংস্কৃতসহ বহু ভাষায় ছিল তাঁর দক্ষতা—যা তাঁর গবেষণা ও বাণীকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

কর্মজীবনে তিনি রাজখালী আলিয়া মাদ্রাসা ও রঙ্গিখালী ফাজিল মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ধর্মীয় আলোচনার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ইমামগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘদিন মিরপুর সমাজ কল্যাণ জামে মসজিদের পেশ ইমাম হিসেবে কাজ করেন।

একজন স্বনামধন্য ইসলামী বক্তা হিসেবে তিনি দেশে-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, জাপান, কোরিয়া—বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি ইসলামের শান্তির বার্তা পৌঁছে দেন। তাঁর ওয়াজ শুনে বহু ব্যক্তি ইসলামের প্রতি অনুপ্রাণিত হন। তিনি আমৃত্যু বাংলাদেশ মাজলিসুল মুফাসসিরীন-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন।

ইবাদত-বন্দেগী ও প্রচারমূলক কাজের পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে বহু মসজিদ, মাদ্রাসা, হাফেজিয়া ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন দারুল কোরআন ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা—যা এলাকার ধর্মীয় শিক্ষায় নতুন দিশা এনে দেয়।

এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি—প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের কান্ট্রি চেয়ারম্যান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসায় জিএস এবং পরবর্তীতে কামিল পড়াকালে ভিপি নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

পরিণত বয়সে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রুকন হিসেবে ইকামাতে দ্বীনের দাওয়াতে আজীবন কাজ করে যান। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।

আল্লামা লুৎফর রহমান ছিলেন একাধারে মুফাসসির ও গবেষক। তিনি বহু মূল্যবান রচনা রেখে গেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • চার ইমামের জীবনী

  • আল কোরআনের বিষয়ভিত্তিক অভিধান

  • আসান ফেকাহ্‌

  • তাম্বিহুল গাফেলিন

  • মুসলিম জাহানের চার খলিফার জীবনী

  • হযরত ওমর ফারুক রা.-এর জীবনী

  • চারিত্রিক পবিত্রতা ও সতীত্ব রক্ষার বিধান

  • ইসলামের ফরজ বিধান পর্দা ইত্যাদি।

এই গ্রন্থসমূহ গবেষক, ছাত্র এবং সাধারণ পাঠকের কাছে সমান জনপ্রিয়।

২০২৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সকালে নিজ বাড়িতে তিনি ব্রেনস্ট্রোকে আক্রান্ত হন। প্রথমে তাকে লক্ষ্মীপুর আধুনিক হাসপাতালে এবং পরে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি তাঁর ব্রেন অপারেশন সম্পন্ন হলেও তিনি আর জ্ঞান ফেরেননি। অবশেষে ৩ মার্চ দুপুর ২টা ৫৪ মিনিটে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় সংগঠন ও বিশিষ্টজনেরা গভীর শোক প্রকাশ করেন।

Source : wikipedia, dhaka mail,palabadal

প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window