বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আ স ম আবদুর রব এমন এক নাম, যার ভূমিকা স্বাধীনতার প্রস্তুতি, ছাত্র রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলনের ঘটনা তাঁকে ইতিহাসে স্থায়ীভাবে চিহ্নিত করেছে। তিনি সেই সময় ডাকসুর ভিপি এবং ছাত্র সংগ্রামের সামনের সারির নেতা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই বটতলায় শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে জাতীয় পতাকা হস্তান্তর করা হয় এবং পরদিন তিনি শেখ মুজিবকে প্রথমবারের মতো “জাতির জনক” বলে সম্বোধন করেন।

আ স ম আবদুর রব জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ২ জানুয়ারি তৎকালীন নোয়াখালীর অংশ লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার চরবাদাম গ্রামে। তাঁর বাবা আলী আজ্জম ও মা মাজেদা খাতুন—উভয়েই ছিলেন সমাজ-সচেতন ও সাদামাটাভাবে জীবনযাপনকারী মানুষ। ছোটবেলা থেকেই রব নেতৃত্বের গুণ দেখাতে শুরু করেন, যা পরে ছাত্র রাজনীতিতে তাঁর প্রবল সক্রিয়তায় রূপ নেয়।

প্রাথমিক শিক্ষার পর তিনি নোয়াখালী পৌর কল্যাণ হাই স্কুল থেকে মেট্রিক সম্পন্ন করেন। এরপর চৌমুহনী এসএ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা আরও গভীর হয় এবং তিনি স্বৈরশাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় চলে আসেন।

আ স ম আবদুর রবের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু স্কুলজীবনে, ১৯৫৮ সালে যখন তিনি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। ষাটের দশকে তিনি অন্যতম ছাত্রনেতা হয়ে ওঠেন।

১৯৭১ সালের ২ মার্চ ইতিহাসের সেই গুরুত্বপূর্ণ দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুকে স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রসংবলিত পতাকা উত্তোলন করেন আ স ম আবদুর রব। তাঁর সঙ্গে ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন ও শাজাহান সিরাজ।
এই ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার জনসমর্থন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।

৩ মার্চ ১৯৭১ পল্টন ময়দানে সমাবেশে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথমবারের মতো “জাতির জনক” উপাধিতে ভূষিত করেন। এটি আজও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।

তিনি ১৯৭০–৭১ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) ছিলেন।
এ সময় ছাত্রসমাজের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠকে পরিণত হন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর আ স ম আবদুর রব ও শাজাহান সিরাজের উদ্যোগে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) গঠিত হয়। ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত দলের প্রথম জাতীয় সম্মেলনে মেজর জলিল সভাপতি, আবদুর রব সাধারণ সম্পাদক এবং ইনুসহ অন্যান্য নেতারা বিভিন্ন পদে নির্বাচিত হন।
জাসদের প্রতিষ্ঠা ছিল সমাজতন্ত্রভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার ও পরিবর্তনের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।

আ স ম আবদুর রব তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
• ১৯৮৬ – লক্ষ্মীপুর–৪ (জাসদ)
• ১৯৮৮ – ঢাকা–১০ (জাসদ, বিরোধী দলের নেতা)
• ১৯৯৬ – লক্ষ্মীপুর–৪ (জাসদ)

১৯৯1, 2001 ও 2008 সালের নির্বাচনে তিনি লক্ষ্মীপুর–৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাসদ আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিলে তাঁর দল সরকারে অংশ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় তিনি শেখ হাসিনার প্রথম মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
• নৌপরিবহন মন্ত্রী: ২৯ জুন ১৯৯৬ – ২৪ ডিসেম্বর ১৯৯৮
• মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী: ২৪ ডিসেম্বর ১৯৯৮ – ১৫ জুলাই ২০০১

এ সময় তিনি সামুদ্রিক সম্পদ, মাছ উৎপাদন ও বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়নমূলক বেশ কিছু উদ্যোগ নেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সক্রিয় হন।

তাঁর স্ত্রী তানিয়া রব। তাঁদের তিন ছেলে।
• বড় ছেলে – স্ত্রীসহ বোস্টন
• মেজ ছেলে – নিউইয়র্ক
• ছোট ছেলে – ব্যাংকক

তাঁদের পরিবার পরবর্তীতে পেশাগত কারণে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকলেও রব রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়ই রয়েছেন।

সূত্র : 

১. বিবিসি বাংলা – বাংলাদেশের প্রথম পতাকা তৈরি ও উড়ানোর কাহিনী
২. প্রিয়.কম – আ স ম আবদুর রব
৩. সংগ্রামের নোটবুক – ডাকসুর ভিপিদের তালিকা
৪. প্রথম আলো – আ স ম আবদুর রব, লক্ষ্মীপুর–৪
৫. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন – নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রীরা
৬. জয়নাল আবেদীন, উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী ও বামধারার রাজনীতি, ২০১৩
৭. বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ – ৩য়, ৪র্থ, ৭ম সংসদের সদস্য তালিকা

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window