এক নজরে সোনাগাজী উপজেলা

ফেনী জেলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত সোনাগাজী উপজেলা ইতিহাস, কৃষি, মৎস্য ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অবদানে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল।

নামকরণ

ধারণা করা হয়, পলাশী যুদ্ধের পর ১৭৮০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে নয়নগাজী নামে এক ইসলাম প্রচারক এ এলাকায় আসেন। তাঁর ছেলে সোনাগাজী ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তি। তাঁর নামানুসারেই উপজেলার নামকরণ হয় সোনাগাজী। আবার অন্য এক কিংবদন্তিতে বলা হয়, বাংলার বারো ভূঁইয়ার একজন ফজলগাজীর নাতি সোনাগাজী ছিলেন প্রতাপশালী জমিদার, তাঁর নামেই এ এলাকার নামকরণ।

উপজেলাটির আয়তন প্রায় ২৮৪.৯ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে ফেনী সদর ও দাগনভূঞা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে মীরসরাই এবং পশ্চিমে কোম্পানীগঞ্জ ও দাগনভূঞা উপজেলা এর সীমানা ঘিরে রেখেছে।

প্রশাসনিক কাঠামো ও জনসংখ্যা

সোনাগাজী থানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২০ সালে এবং ১৯৮৩ সালে এটি উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। এতে ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা রয়েছে। মোট মৌজা ৯৪টি ও গ্রাম ৯৭টি।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী উপজেলায় ৪৯,৮১০টি পরিবারে মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ৫৪ হাজার ৯৭৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ২৫ হাজার ৩৯০ এবং নারী ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৮৪ জন।

শিক্ষা ও সাক্ষরতা

উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১০৮টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ২৪টি, দাখিল মাদ্রাসা ১৩টি ও সরকারি কলেজ ১টি রয়েছে। সামগ্রিক শিক্ষার হার ৬১ শতাংশ। সোনাগাজী সরকারি কলেজ, মঙ্গলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়, নবাবপুর হাই স্কুল, আমিরাবাদ বি সি লাহা স্কুলসহ একাধিক ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখানে অবস্থিত।

অর্থনীতি ও কৃষি

কৃষিই এখানকার প্রধান জীবিকা। মোট আবাদযোগ্য জমি প্রায় ২২ হাজার হেক্টর, যার মধ্যে দুই ও তিন ফসলি জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। ধান, গম, আলু, ডাল, সরিষা, শাকসবজি, কলা, পেঁপে ও কাঁঠাল প্রধান কৃষিপণ্য। উপজেলায় ২৮টি কৃষি ব্লক এবং ৯টি বীজাগার রয়েছে। বছরে প্রায় ৬৯ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন হয়, যা চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ

সোনাগাজী মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ একটি উপকূলীয় উপজেলা। প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ পুকুরে চাষ হয় মাছ ও চিংড়ি। মোট মাছ উৎপাদন ৪ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন। এখানে একটি আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার ও একটি মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র রয়েছে।
প্রাণিসম্পদ খাতে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির সংখ্যা ২ লাখের বেশি। উপজেলায় ১টি প্রাণী সম্পদ হাসপাতাল ও ৪টি কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র চালু আছে।

স্বাস্থ্যসেবা

সরকারি হাসপাতাল ২টি, ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ৫টি এবং ৩২টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে মোট বেড সংখ্যা ৭০টি।

যোগাযোগ ব্যবস্থা

সোনাগাজীর সঙ্গে জেলা সদর ও আশপাশের এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা তুলনামূলক উন্নত। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় ৬০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এলজিইডির আওতায় মোট রাস্তার দৈর্ঘ্য ৬৬৪ কিলোমিটার, যার মধ্যে ২৭৫ কিলোমিটার পাকা। নদীপথেও ৪৪ কিলোমিটার নৌযান চলাচল করে।

মুক্তিযুদ্ধে সোনাগাজী

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সোনাগাজী ছিল বীরদের ভূমি। এখানে ৬৭১ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশ নেন, শহীদ হন ৩৯ জন। বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত আহছান উল্যাহ ও রুহুল আমিন এই উপজেলার গর্ব। মতিগঞ্জ, বক্তার মুন্সী, বাদামতলী ও ভোরবাজার এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রকল্প

বর্তমানে সোনাগাজীতে একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণাধীন। প্রায় ৫ হাজার একর জমির ওপর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে।

সামাজিক ও সরকারি সেবা

বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ হাজার। উপজেলা সমাজসেবা, মহিলা বিষয়ক ও যুব উন্নয়ন অফিসের অধীনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চলছে।

ধর্ম ও সংস্কৃতি

উপজেলায় প্রায় ৭০০টি মসজিদ ও ২৫টি মন্দির রয়েছে। সোনাগাজী ও আশপাশের হাটবাজারগুলো (যেমন বক্তার মুন্সী হাট, মঙ্গলকান্দি হাট, ভোর বাজার) স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার করে। এখানে লোকসংস্কৃতি, ক্লাব, মহিলা সংগঠন ও ক্রীড়া কার্যক্রমও বেশ সক্রিয়।

প্রকৃতি ও জনজীবনের বৈচিত্র্যে ভরা সোনাগাজী আজ শিক্ষা, কৃষি, মৎস্য ও শিল্পের বিকাশে এক সম্ভাবনাময় উপকূলীয় উপজেলা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

সুত্র: sonagazi.feni.gov.bd, bn.banglapedia.org

ফেনী জেলার ইতিহাস: নদীর নামেই জেলার পরিচয়

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window