বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যে কয়েকজন যোদ্ধা অসামান্য সাহস ও রণকৌশল প্রদর্শনের মাধ্যমে বীরত্বের অমর দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছেন, এস আই এম নূরুন্নবী খান তাদের অন্যতম। ১৯৪২ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মীধরপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি শৈশব থেকে শিক্ষাজীবন পর্যন্ত ছিলেন মেধা, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার অসাধারণ অবদান এবং অদম্য নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাকে সম্মানিত করে বীর বিক্রম খেতাবে—যা তার জীবনযুদ্ধের প্রকৃত মূল্যায়ন।
নূরুন্নবী খানের শৈশব কেটেছে লক্ষ্মীধরপাড়ার গ্রামীণ পরিবেশে। বাবা হাবীবউল্লাহ খান ও মা শামছুন নাহার বেগমের স্নেহে বেড়ে ওঠা এই বীর মুক্তিযোদ্ধার ব্যক্তিত্বে পরিবার থেকে পাওয়া মূল্যবোধ ছিল গভীরভাবে প্রোথিত। তার দুই স্ত্রী—জাকিয়া মাহমুদা ও সুলতানা নবী—এবং এক ছেলে ও তিন মেয়ের সমন্বয়ে তার পরিবার জীবন ছিল সুগঠিত ও স্নেহময়।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট)। সেখানে তিনি শুধু মেধাবী শিক্ষার্থী নন, বরং সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি এবং বুয়েট ছাত্র সংসদের সহসভাপতি হিসেবে তিনি নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তার ভূমিকা ছিল প্রত্যক্ষ, যা ভবিষ্যতের বীরত্বগাথার পূর্বাভাসের মতো।
প্রকৌশলবিদ্যার পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর প্রতি তার আগ্রহ তাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কোয়েটায় প্রশিক্ষণে অবস্থান করছিলেন। দেশের পরিস্থিতি জেনে ২৭ মার্চ কৌশলে কোয়েটা ত্যাগ করে দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের সঙ্গে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং পালিয়ে যান মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে এই প্রত্যাবর্তন ছিল তার অবিনশ্বর দেশপ্রেমের প্রমাণ।
ভারতে প্রবেশের পর তিনি কিছুদিন মেজর জেনারেল এম এ জি ওসমানীর এডিসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তাকে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডেলটা কোম্পানির অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। যুদ্ধক্ষেত্রে তার উপস্থিতিই ছিল অনুপ্রেরণা। বাহাদুরাবাদ, ছাতক, গোয়াইনঘাট, রাধানগর, ছোটখেল ও সালুটিকর—প্রতিটি যুদ্ধে তিনি দেখিয়েছেন অসাধারণ বিচক্ষণতা ও রণনৈপুণ্য। তার নেতৃত্বে ডেলটা কোম্পানির যোদ্ধারা বহু শত্রু ঘাঁটি দখল করে বিজয় অর্জন করেন।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরুতে সিলেটের সালুটিকর ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যন্ত শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অবস্থান। বিমানঘাঁটির নিকটবর্তী এই এলাকা মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গনে পরিণত হয়। কয়েক দিনব্যাপী তীব্র যুদ্ধের পর ১২ ডিসেম্বর শুরু হয় চূড়ান্ত লড়াই।
সেদিন ভোরে পাকিস্তানি সেনারা মুক্তিবাহিনীর অবস্থানে তীব্র আর্টিলারি হামলা চালায়। পরপর হামলার জবাব দেওয়ার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধারা অপেক্ষা করতে থাকে শত্রুকে আরও কাছে টানার জন্য। এসময় অধিনায়ক নূরুন্নবী খান গোলাগুলি বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন—যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
পাকিস্তানি সেনারা যখন মাত্র ১০ গজ দূরত্বে এসে পড়ে এবং নিশ্চিত হয় যে মুক্তিযোদ্ধারা হয় পালিয়েছে নয়তো মনোবল হারিয়েছে, তখনই নূরুন্নবী খান বজ্রকণ্ঠে আদেশ দেন—“হ্যান্ডস আপ!”
এই আকস্মিক কঠিন নির্দেশে শত্রুরা হতভম্ব হয়ে যায়। সামনের সারির অনেক সৈন্য সঙ্গে সঙ্গেই আত্মসমর্পণ করে এবং পেছনের সারিররা দৌড়ে পালাতে থাকে। ঠিক সেই মুহূর্তে শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণ। অল্প সময়েই বহু পাকিস্তানি সেনা নিহত হয় এবং কয়েকজন বন্দী হয়ে পড়ে। সন্ধ্যা নামার আগেই পুরো সালুটিকর এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
এই যুদ্ধের কারণেই এস আই এম নূরুন্নবী খানের নেতৃত্ব ও দূরদর্শিতা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নূরুন্নবী খান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যের রয়েল মিলিটারি সায়েন্স কলেজে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরমাণু প্রকৌশলে ডিগ্রি অর্জন করেন, যা তার বহুমাত্রিক দক্ষতার পরিচয় বহন করে।
তবে ১৯৮০ সালে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়। সামরিক জীবনের পর তিনি মনোনিবেশ করেন লেখালেখি ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে। প্রতিষ্ঠা করেন ‘কলম্বিয়া প্রকাশনী’।
তার লেখা বারোটি গ্রন্থ—যার মধ্যে জীবনের যুদ্ধ যুদ্ধের জীবন, রৌমারী রণাঙ্গন, অপারেশন বাহাদুরাবাদ, অপারেশন রাধানগর ও অপারেশন সালুটিকর—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমূল্য সম্পদ।
মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন বাংলাদেশের অন্যতম বীরত্বসূচক খেতাব—বীর বিক্রম।
২০১৯ সালের ২২ মে, ৭৭ বছর বয়সে এই মহান মুক্তিযোদ্ধা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার জীবন সংগ্রাম, বীরত্ব, দেশপ্রেম ও লেখালেখি আজও নতুন প্রজন্মের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।
প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।
তথ্যসূত্র : wikipedia
Last modified: নভেম্বর ১৯, ২০২৫