বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁরা শিক্ষিত ও পাণ্ডিত্যের সংমিশ্রণে দেশের গণমাধ্যম ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এহতেশাম হায়দার চৌধুরী ছিলেন সেই ধরনের একজন মানুষ, যিনি সাংবাদিকতা, সম্পাদকীয় কাজ এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও সাহিত্য জগতে চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছেন।

এহতেশাম হায়দার চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩১ সালে, বেগমগঞ্জ উপজেলার খালিশপুর গ্রামে। তাঁর পিতা মরহুম বজলুর রহমান এবং মাতা মাহফুজা খাতুন। পরিবারিক পরিবেশ তাঁকে শিক্ষার প্রতি আগ্রহী ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হতে উৎসাহী করে তুলেছিল।

শৈশব থেকেই তিনি সাহিত্য ও সাংবাদিকতার প্রতি প্রবল আগ্রহী ছিলেন। পারিবারিক অনুপ্রেরণা এবং নিজস্ব মেধা তাঁকে একটি দিকনির্দেশনা দিয়েছে, যা পরবর্তীতে তাঁর জীবনের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

এহতেশাম হায়দার চৌধুরী দেশের গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে পূর্বানী, পূর্বদেশ, দৈনিক বাংলা এবং বিচিত্রা-র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর সম্পাদকীয় কাজ কেবল সংবাদ পরিবেশন বা প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি সাংবাদিকতাকে দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে দেখতেন।

তিনি দীর্ঘদিন দৈনিক ইত্তেফাক-এ কর্মরত ছিলেন, যেখানে তাঁর দায়িত্ব ও দক্ষতা দেশের সাংবাদিকতায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপন করেছিল। তাঁর সাংবাদিকতা ও সম্পাদকীয় কাজের মাধ্যমে সংবাদ মাধ্যমকে সমসাময়িক সমাজের চিত্রের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা সম্ভব হয়েছে।

এহতেশাম হায়দার চৌধুরী সরকারী সংবাদপত্র ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এই পদে তিনি সংবাদপত্রের মান, তথ্য পরিবেশন এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

তাঁর নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতা দেশের গণমাধ্যমে একটি পেশাদার মান প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ছিল। শুধু সাংবাদিক নয়, বরং প্রশাসনিক জ্ঞানও তিনি সমানভাবে প্রয়োগ করেছিলেন।

এহতেশাম হায়দার চৌধুরী সাহিত্যিক দিকেও সমানভাবে দক্ষ ছিলেন। তিনি বিশেষভাবে অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশে অবদান রেখেছেন। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো—‘মেটামর ফসিস’ (অভিদ)। এই কাজের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্যকর্মকে বাংলা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

তাঁর পরিবারও সাহিত্যিক পরিচয় সমৃদ্ধ ছিল। বিশিষ্ট সাহিত্যিক মরহুম মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী এবং সাহিত্যিক লুৎফুল হায়দার চৌধুরী তাঁর ভাই। পরিবারিক এই সাহিত্যপ্রবণ পরিবেশ তাঁকে সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে উৎসাহী ও সৃজনশীল করে তুলেছিল।

এহতেশাম হায়দার চৌধুরী শুধু সাংবাদিক ও সাহিত্যিকই ছিলেন না; তিনি সমাজ ও সংস্কৃতিতে সক্রিয়। দেশের সংবাদ ও সাহিত্যচর্চার মান উন্নয়নে তাঁর অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয়।

সাংবাদিকতা, সম্পাদকীয় দায়িত্ব এবং সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তিনি দেশের গণমাধ্যম ও পাঠক সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর কর্মকাণ্ড সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি ও সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জনাব এহতেশাম হায়দার চৌধুরী ১৯৮৪ সালে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সাহিত্য জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে ধরা হয়।

যাইহোক, তাঁর প্রকাশনা, সম্পাদকীয় অবদান এবং সাহিত্যিক কাজ আজও বাংলাদেশের সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

এহতেশাম হায়দার চৌধুরী ছিলেন সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে এক বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তি। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে, পাণ্ডিত্য, সৃজনশীলতা এবং সমাজসেবা একত্রে একজন ব্যক্তিকে তার সময়ের অমর প্রভাবশালী চরিত্রে রূপ দিতে পারে।

তিনি শুধু সাংবাদিকতা ও সাহিত্যকর্মে অবদান রাখেননি, বরং দেশের সংবাদপত্র ব্যবস্থাপনা, অনুবাদ সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window