এক প্রজ্ঞাবান সাংবাদিক, প্রশাসক ও সাহিত্যিক, যিনি দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে বেতার খাতের মান উন্নয়নে এবং দেশের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য ক্ষেত্রের সমৃদ্ধিতে অনন্য অবদান রেখেছেন। তাঁর জীবন ও কর্মগাথা একত্রে প্রতিফলিত করে এক নৈতিক, বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন এবং সৃজনশীল মানুষের চিত্র।

১৯৩৫ সালে নোয়াখালীতে জন্মগ্রহণ করেন এ. আর. শরীফ। শৈশব ও কিশোর বয়স থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি নোয়াখালী চৌমুহনী কলেজে অধ্যয়ন করেন। কলেজে শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মননশীল এবং অধ্যবসায়ী ছাত্র। ১৯৫৫ সালে চৌমুহনী কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বিএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন—একটি প্রমাণ তাঁর মেধা ও পরিশ্রমের।

পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৫৭ সালে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি বেতার ও গণমাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু করেন। ১৯৬০ সালে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানে যোগ দিয়ে তিনি রেডিওর অনুষ্ঠান এবং বার্তা বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে নিযুক্ত হন। এই সময়ে তাঁর নিবেদন, পেশাগত দক্ষতা ও সাংগঠনিক ক্ষমতা তাঁকে একজন প্রতিষ্ঠিত বেতার সাংবাদিক হিসেবে গড়ে তোলে।

জনাব শরীফ ১৯৭১ সাল পর্যন্ত রেডিও পাকিস্তানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭৮ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে থাকাকালীন তিনি প্রেস ও গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিফলিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

তাঁর পেশাগত জীবনে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ছিল সমৃদ্ধ। তিনি রেডিওর বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক ফোরামে যোগদান করেন, যেখানে তিনি বাংলাদেশের সংস্কৃতি, জনসংযোগ এবং সংবাদ পরিবেশনের মান উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে তিনি রেডিও বাংলাদেশের উপ-মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং দেশের বেতার খাতের উন্নয়নে অব্যাহতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এ. আর. শরীফের অবদানও সমানভাবে প্রশংসনীয়। তিনি একাধারে সৃজনশীল ও বিশ্লেষণধর্মী লেখক। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে ‘প্রাচ্যের প্রেম কাহিনী’, ‘ধান বোনার গান’ এবং ‘আরব ইতিহাস’। এসব লেখা শুধু সাহিত্যপ্রেমীদের জন্যই নয়, বরং শিক্ষাজগৎ ও ইতিহাসচর্চার জন্যও মূল্যবান। এছাড়া তাঁর সাম্প্রতিক রচনা ‘বঙ্গভবনে চার বছর’ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে, যা বাংলাদেশ সরকারের অভ্যন্তরীণ ইতিহাস এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে।

ব্যক্তিগত জীবনে এ. আর. শরীফ ছিলেন বিনয়ী, ধৈর্যশীল ও সংযমী। সহকর্মীরা তাঁকে মনে রাখেন একজন নৈতিক সাংবাদিক ও দায়িত্বশীল প্রশাসক হিসেবে, যিনি কখনো পেশাগত নিষ্ঠা ও সততার মান বজায় রাখতে দ্বিধা করেননি। তিনি প্রতিটি কাজকে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে দৃঢ় সংকল্পী ছিলেন এবং তরুণদের জন্য ছিলেন এক অনুপ্রেরণার উৎস।

সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য তাঁর বহুমাত্রিক প্রতিভারই প্রতিফলন। তিনি প্রমাণ করেছেন, একাধারে পেশাদার দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ এবং সৃজনশীল মনোভাব অর্জন করলে যে কোনো ক্ষেত্রে দেশের উন্নয়ন ও মানুষের সেবা করা সম্ভব।

এ. আর. শরীফের জীবনগাথা বাংলাদেশের গণমাধ্যম, সাহিত্য ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এক অনন্য অধ্যায়। তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি সততা, নৈতিকতা, দূরদর্শিতা এবং সৃজনশীলতার সমন্বয়ে দেশের গণমাধ্যম খাতকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window