বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের সীমানা পেরিয়ে এক অনন্য মর্যাদায় অবস্থান করছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব বিচারপতি এ. কে. এম. বাকের। দীর্ঘ কর্মজীবন, নিষ্ঠা, নৈতিকতা এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তিনি রেখে গেছেন গভীর ছাপ, যা আজও অনুপ্রেরণার উৎস।
বিচারপতি এ. কে. এম. বাকের ১৯০৮ সালে এক শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার আহমদপুর গ্রামে। পিতা মরহুম আবদুল আজিজ সাহেব ছিলেন ব্রিটিশ আমলের একজন সম্মানিত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, যিনি সততা ও দায়িত্ববোধের জন্য পরিচিত ছিলেন। এই পরিবারের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধই ভবিষ্যতে বাকের সাহেবের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই এ. কে. এম. বাকের ছিলেন মেধাবী ও মননশীল ছাত্র। তিনি ১৯২৯ সালে কলকাতার নামকরা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চতর শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে ১৯৩১ সালে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। সাহিত্যচর্চা তাঁর মননকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি আইন বিষয়ে গভীর আগ্রহও জন্ম দেয়।
পরে তিনি লন্ডনে গিয়ে ১৯৩৮ সালে এল.এল.বি. এবং বার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থায় এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আন্তর্জাতিক মানের আইনজীবী হিসেবে গড়ে তোলে।
শিক্ষা শেষ করে এ. কে. এম. বাকের কলকাতা হাইকোর্টে ব্যারিস্টার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর তীক্ষ্ণ মেধা, স্পষ্ট যুক্তি ও সততা তাঁকে দ্রুতই সুনাম এনে দেয়। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং নবগঠিত ঢাকা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। একই সঙ্গে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে যুক্ত হন।
১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে, ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তিনি বিচারপতি পদে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রায়গুলোতে দেখা যেত যুক্তির দৃঢ়তা, ন্যায়বোধের স্বচ্ছতা এবং মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি।
বিচারপতি বাকের শুধু আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের বিভিন্ন বিভাগেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। জনসেবামূলক কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহের কারণে তাঁকে প্রায়ই বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনারে কলকাতা কর্পোরেশনের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হতো। প্রশাসনিক দক্ষতা ও সংগঠক হিসেবে তাঁর প্রতিভা তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল।
আইনজীবী হিসেবে সফলতা অর্জনের পাশাপাশি এ. কে. এম. বাকের সমাজকল্যাণমূলক কাজেও ছিলেন গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘রহমতে আলম ইসলামী মিশন ও এতিমখানা’, ‘বাদশা ফয়সল ইনস্টিটিউট’ এবং ‘বাদশা ফয়সল ট্রাস্ট’। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের শিক্ষা ও পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
তিনি ইসলামী ভাবধারায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন। সেই সূত্রে তিনি ইসলামী মিশনের প্রেসিডেন্ট এবং পাকিস্তানের ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইসলামাবাদ)-এর সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা বৃদ্ধিতে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
বিচারপতি বাকেরের জীবন কেবল আইন ও সমাজসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিও সমানভাবে আগ্রহী ছিলেন। তিনি ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে ক্লাবটি টানা তিনবার লীগ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে, যা তখনকার সময়ে বিরল সাফল্য ছিল। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেও তিনি ছিলেন উদ্যমী, ন্যায্য ও জনপ্রিয়।
বিচারপতি এ. কে. এম. বাকের কেবল আইনজ্ঞই নন, তিনি ছিলেন একজন চিন্তাশীল লেখকও। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য দুটি গ্রন্থ হলো — ‘Quranic Gems’ এবং ‘কোরআন চয়নীকা’। এই বইগুলোতে তিনি কোরআনের বাণীকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে সাধারণ মানুষ ধর্মীয় শিক্ষার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারেন। তাঁর লেখনীতে ছিল একদিকে গভীর ধর্মীয় অন্তর্দৃষ্টি, অন্যদিকে যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ।
বিচারপতি বাকের ছিলেন সৌম্য, বিনয়ী এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তিনি সবসময়ই সততা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করতেন। তাঁর পরিবারেও ছিল শিক্ষিত ও প্রভাবশালী সদস্যদের উপস্থিতি। তাঁর অগ্রজ ছিলেন বিচারপতি আমীন আহমদ, যিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুই ভাইয়ের এই অনন্য কৃতিত্ব পরিবারটিকে এক বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে।
বিচারপতি এ. কে. এম. বাকেরের জীবন ছিল ন্যায়ের প্রতি অবিচল আনুগত্য, মানবতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং সমাজ উন্নয়নের অদম্য প্রচেষ্টার প্রতীক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো আজও সমাজে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। আইন ও বিচারব্যবস্থায় তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিচারপতি বাকের প্রমাণ করে গেছেন যে, একজন শিক্ষিত, নীতিবান ও দেশপ্রেমিক মানুষ কেবল নিজের নয়, সমগ্র সমাজের পরিবর্তন ঘটাতে পারেন। তাঁর জীবন ও কর্ম আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে — ন্যায়, জ্ঞান ও মানবতার পথে এগিয়ে যেতে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৬, ২০২৫