অত্যন্ত ধীর, মননশীল ও নিষ্ঠাবান ব্যাংকার এ. কে. এম. সাইয়েদুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের এক প্রাজ্ঞ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তাঁর কর্মজীবন ছিল এক দীর্ঘ ও সফল যাত্রা—যেখানে দায়িত্ববোধ, সততা এবং দক্ষতার সমন্বয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য উদাহরণ।
১৯৩১ সালে নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার ওয়াছেকপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পরিবারে ছিলেন ছয় ভাইয়ের মধ্যে চতুর্থ সন্তান। পিতা মরহুম কাজী হাবিবুর রহমান ছিলেন রায়পুর থানার সাব-রেজিস্টার, একজন সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি। পিতার কর্মনিষ্ঠা ও নৈতিক আদর্শ থেকেই সাইয়েদুর রহমানের জীবনে গড়ে ওঠে দায়িত্ববোধ ও সততার মজবুত ভিত্তি।
শিক্ষাজীবনের শুরু হয় নোয়াখালীর বিখ্যাত বঙ্গবিদ্যালয়ে। সেখানে মাইনর শিক্ষা শেষ করে তিনি ভর্তি হন নোয়াখালী জেলা স্কুলে, যেখান থেকে ১৯৪৭ সালে সফলভাবে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন অধ্যবসায়ী ও মেধাবী। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাণিজ্য বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি মনস্থির করেন পেশাগত জীবনে প্রবেশের, এবং সেই সূত্রেই শুরু হয় তাঁর ব্যাংকিং জগতে পদার্পণ।
১৯৫০ সালে এ. কে. এম. সাইয়েদুর রহমান যোগ দেন তৎকালীন ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়াতে (বর্তমান স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া) শিক্ষানবিশ কর্মচারী হিসেবে। এখানেই শুরু হয় তাঁর ব্যাংকিং জীবনের প্রথম অধ্যায়। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তাঁর সততা, নিষ্ঠা ও কর্মদক্ষতা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৫২ সালে তিনি যোগ দেন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে, যেখানে তিনি দীর্ঘ ১৬ বছর—অর্থাৎ ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ব্যাংকিং খাতের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো তিনি এই সময়েই আয়ত্ত করেন এবং নিজেকে এক দক্ষ প্রশাসক ও প্রাজ্ঞ আর্থিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৭২ সালে তিনি নবগঠিত সোনালী ব্যাংকে যোগ দেন আঞ্চলিক প্রধান (Regional Manager) হিসেবে এবং দায়িত্ব পান ময়মনসিংহ অঞ্চলের। নতুন রাষ্ট্রে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্বে ময়মনসিংহ অঞ্চলের সোনালী ব্যাংক দ্রুত সংগঠিত হয় এবং সেবার পরিধি বাড়ায় সাধারণ মানুষের কাছে।
তাঁর সাফল্য ও দক্ষতা বিবেচনায় ১৯৭২-৭৩ সালে তাঁকে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে “Inspector of Branches” হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। শাখা পর্যায়ের কার্যক্রম তদারকিতে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ও সঠিক সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির নীতি নির্ধারণে নতুন দিক নির্দেশ করে।
১৯৭৩ সালে তিনি পদোন্নতি পেয়ে সহকারী মহাব্যবস্থাপক (Assistant General Manager) হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে উপ-মহাব্যবস্থাপক (Deputy General Manager) পদে উন্নীত হন, যা ছিল তাঁর নিষ্ঠা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার স্বীকৃতি। সর্বশেষ ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি যোগ দেন অগ্রণী ব্যাংকে মহাব্যবস্থাপক (General Manager) হিসেবে—যা ছিল তাঁর কর্মজীবনের এক অনন্য শিখর। এই সময়ে তিনি ব্যাংকের নীতি প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন, এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তাঁর পেশাগত জীবনে শিক্ষালাভ ও প্রশিক্ষণের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। ব্যাংকিং পেশায় নিজেকে সর্বদা হালনাগাদ রাখতে তিনি দেশ-বিদেশে একাধিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে করাচীতে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান স্টাফ কলেজে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন, যা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিকে আন্তর্জাতিক মানে সমৃদ্ধ করে। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৬২ সালে, তিনি ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স, পাকিস্তান থেকে ব্যাংকিং ডিপ্লোমা অর্জন করেন। এই ডিপ্লোমা অর্জন তাঁর পেশাগত জ্ঞানকে আরও গভীর করে তোলে এবং ব্যাংকিং নীতিমালা, ঋণনীতি ও আর্থিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাঁকে এক বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ব্যাংকিং পেশায় দীর্ঘ সময় কাজ করার পাশাপাশি জনাব এ. কে. এম. সাইয়েদুর রহমান ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ও পরামর্শক। তিনি ইনস্টিটিউট অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ-এর একজন পরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তরুণ ব্যাংকারদের প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন ও দিকনির্দেশনায় তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন একজন মৃদুভাষী, সাহায্যপ্রবণ ও উচ্চ আদর্শে অনুপ্রাণিত মানুষ।
তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে স্মরণ করেন এক আদর্শ প্রশাসক ও অনুপ্রেরণাদায়ী নেতৃত্ব হিসেবে। তিনি কখনও ক্ষমতার অপব্যবহার করেননি, বরং প্রতিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ও দেশের স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। কাজের ক্ষেত্রে তাঁর সুনির্দিষ্টতা, সময়ানুবর্তিতা ও নীতিনিষ্ঠা ছিল অনুসরণযোগ্য।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন বিনয়ী ও পরিবারপ্রেমী। দায়িত্বের প্রতি যেমন ছিলেন কঠোর, তেমনি মানবিকতার জায়গায়ও ছিলেন সংবেদনশীল। সহকর্মীদের সমস্যা শুনতেন মনোযোগ দিয়ে এবং তাঁদের পাশে দাঁড়াতেন পরামর্শ ও সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে।
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়জুড়ে ব্যাংকিং খাতের নানা পরিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন তিনি। ঔপনিবেশিক আমলের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং যুগ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান ছিল দৃশ্যমান। তাঁর মতো পেশাদারদের হাত ধরেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে যায় এক শক্ত ভিত্তির উপর।
এ. কে. এম. সাইয়েদুর রহমান ছিলেন এমন এক ব্যাংকার, যিনি শুধু পেশাগত দক্ষতায় নয়, নৈতিকতা ও মানবিকতার দিক থেকেও ছিলেন এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর জীবনগাথা বাংলাদেশের আর্থিক খাতের বিকাশগাথারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যেখানে দায়িত্ব, সততা ও আদর্শের মিলনে নির্মিত হয়েছে এক সফল জীবনের মহাকাব্য।
Last modified: অক্টোবর ১৩, ২০২৫