এক বীর বৈমানিক, দক্ষ প্রশাসক ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, যাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় জড়িয়ে আছে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বগুণের উজ্জ্বল উদাহরণে। বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক ইতিহাসে তিনি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যিনি কর্ম, সততা ও সাহসিকতার মাধ্যমে রেখে গেছেন স্থায়ী ছাপ।

১৯৩৪ সালে নোয়াখালীর দাগনভূঞা উপজেলার ইয়াকুবপুর গ্রামের এক সম্মানিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এ. জি. মাহমুদ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন শৃঙ্খলাপরায়ণ ও সাহসী। আকাশযাত্রার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকেই কৈশোরে তিনি নির্ভীক মন নিয়ে বেছে নেন এক ব্যতিক্রমধর্মী জীবনপথ—বৈমানিকের জীবন।

১৯৪৯ সালের অক্টোবরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্কোয়াড্রনে যোগ দিয়ে শুরু করেন তাঁর বৈমানিক জীবন। তখন তাঁর বয়স মাত্র পনেরো। সেখানেই তিনি অর্জন করেন প্রাথমিক উড্ডয়ন প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলাবোধের প্রথম পাঠ। তাঁর প্রতিভা ও নিষ্ঠা অল্প সময়েই প্রশিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরবর্তীতে, ১৯৫২ সালের জুন মাসে, তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন এবং দুই বছরের কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি কমিশন লাভ করেন।

কমিশন পাওয়ার পর তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়ে। তিনি দ্রুতই প্রমাণ করেন যে তিনি শুধু একজন দক্ষ পাইলট নন, বরং একজন কৌশলী নেতা। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং প্রদর্শন করেন অসীম সাহসিকতা ও কৌশলদক্ষতা। যুদ্ধক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি সম্মানিত হন ‘টিবিটি’ খেতাবে—যা সেই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্বীকৃতি।

একজন ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি নবীন পাইলটদের মধ্যে তৈরি করেছিলেন আত্মবিশ্বাস, মনোবল ও পেশাগত নিষ্ঠা। তাঁর প্রশিক্ষণগুণের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পান Air Crew Efficiency Badge, যা কেবলমাত্র শ্রেষ্ঠদেরই প্রদান করা হয়।

১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তান এয়ার ফোর্স স্টাফ কলেজ, করাচীতে যোগ দেন এবং সেখানে তিনি “পি.এস.এ” (Passed Staff College Air) মর্যাদা অর্জন করেন। এটি ছিল একটি উচ্চ পর্যায়ের সামরিক শিক্ষাগত যোগ্যতা, যা তাঁকে পরবর্তীতে প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পদে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি পাকিস্তান এয়ার ফোর্স হেডকোয়ার্টারে “Deputy Director of Training” পদে নিযুক্ত হন, যেখানে তিনি পুরো বাহিনীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের নীতি ও তদারকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তাঁর বিমানচালনার অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিভিন্ন প্রকারের ১৪টি বিমান তিনি দক্ষতার সঙ্গে চালনা করেছেন। এর মধ্যে ছিল যুদ্ধবিমান, প্রশিক্ষণবিমান ও পরিবহনবিমান—প্রত্যেকটিতেই তিনি দেখিয়েছেন অনন্য দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণশক্তি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ বিমানে (Biman Bangladesh Airlines) অপারেশনস ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিরেক্টর হিসেবে। রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থাটিকে গড়ে তুলতে তাঁর ভূমিকা ছিল ভিত্তিমূলের মতো। তিনি প্রশিক্ষণ ও কারিগরি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু করেন, যা পরবর্তীতে বিমানকে আন্তর্জাতিক মানে প্রতিষ্ঠিত হতে সাহায্য করে।

১৯৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে পুনরায় যোগ দিয়ে চট্টগ্রাম বেসের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেন। এটি ছিল এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ, কারণ তখন নবগঠিত বিমান বাহিনীকে সংগঠিত করা, আধুনিকীকরণ করা এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা ছিল সময়ের দাবি। তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বে চট্টগ্রাম বেস একটি কার্যকর ও দক্ষ ইউনিটে পরিণত হয়।

দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, নীতি-নিষ্ঠা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তাঁকে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অধিনায়ক (Chief of Air Staff) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এটি ছিল তাঁর কর্মজীবনের সর্বোচ্চ সাফল্য ও দেশের প্রতি সর্বোচ্চ অবদানের এক স্বীকৃতি। একই বছর প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁকে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেন।

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে যোগ দেওয়ার পর এ. জি. মাহমুদ দায়িত্ব পান খাদ্য, বেসামরিক বিমান চলাচল, পর্যটন, এবং পেট্রোলিয়াম ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের। এই সময় তিনি একাধারে প্রশাসক, পরিকল্পনাবিদ ও উন্নয়নকর্মী হিসেবে জাতীয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিমান চলাচল খাতে আধুনিকীকরণ, পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার প্রবর্তন ঘটে।

১৯৮২ সালে জেনারেল হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের উপদেষ্টা পরিষদেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। তাঁকে দেওয়া হয় খাদ্য, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এই সময় তিনি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, খাদ্য সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে নিরলস কাজ করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের কার্যকরী কাঠামো, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

এ. জি. মাহমুদের জীবন এক পরিপূর্ণ অধ্যায়—যেখানে শৃঙ্খলা, পরিশ্রম ও দেশপ্রেম একসূত্রে গাঁথা। একদিকে তিনি ছিলেন সাহসী যোদ্ধা, অন্যদিকে বিচক্ষণ প্রশাসক ও দূরদর্শী নীতিনির্ধারক।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window