বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের এক অগ্রদূত, যিনি পেশাগত নিষ্ঠা, দূরদর্শিতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়ে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আধুনিকতার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তি বিষয়ে গভীর অনুধাবনের সমন্বয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের টেলিকম ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
১৯২৭ সালের ১লা এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন এ. বি. এম. তাহের। পিতা মোহাম্মদ ইউনুস ও মাতা খায়রুন নেছা ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও আদর্শপ্রাণ অভিভাবক, যাঁদের অনুপ্রেরণায় তাহেরের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই শৃঙ্খলা, পরিশ্রম ও শিক্ষার প্রতি এক গভীর ভালোবাসা গড়ে ওঠে। তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা জীবনে তিনি ছিলেন অধ্যবসায়ী ও কৌতূহলপ্রবণ ছাত্র, বিশেষত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল।
শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং টেলিযোগাযোগ খাতে নিজের কর্মজীবন শুরু করেন—একটি সময় যখন যোগাযোগ প্রযুক্তি ছিল সীমিত ও অবকাঠামোগতভাবে অনুন্নত। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর কর্মনিষ্ঠা, পরিকল্পনাশক্তি ও নেতৃত্বগুণ তাঁকে সহকর্মীদের মাঝে আলাদা করে তোলে।
কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে এ. বি. এম. তাহের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন পরিচালক, বেতার যোগাযোগ করাচী, যেখানে তাঁর মূল দায়িত্ব ছিল টেলিযোগাযোগের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও কারিগরি মানোন্নয়ন। তখনকার পাকিস্তান আমলে এই খাতটি ছিল দ্রুত বিকাশমান, এবং তাহেরের তত্ত্বাবধানে বেতার যোগাযোগ বিভাগে কর্মদক্ষতা ও সংযোগমান বৃদ্ধি পায়।
১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি কুয়েতে নিযুক্ত ছিলেন টেলিযোগাযোগ বিভাগের উপদেষ্টা হিসেবে। এই সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পান। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, এবং টেলিফোন এক্সচেঞ্জের কার্যকারিতা বৃদ্ধি বিষয়ে তিনি অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সরকারে যোগ দিয়ে দায়িত্ব নেন পরিচালক, টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বিভাগ হিসেবে। এটি ছিল দেশের পুনর্গঠন পর্ব—যেখানে যোগাযোগব্যবস্থা ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত ও বিচ্ছিন্ন। তাঁর দক্ষ তত্ত্বাবধানে টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ সেবা পুনর্গঠিত হয়, নতুন অবকাঠামো নির্মিত হয়, এবং সারাদেশে সরকারি দপ্তরগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা সচল করা সম্ভব হয়।
পরবর্তীতে তিনি দায়িত্ব পান টেলিগ্রাফ ও টেলিফোন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে। এটি ছিল তাঁর কর্মজীবনের শীর্ষ স্থান। তাঁর নেতৃত্বে বোর্ডে গৃহীত হয় একাধিক যুগান্তকারী উদ্যোগ—যার মধ্যে ছিল গ্রামীণ টেলিফোন সংযোগ সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, এবং দক্ষ জনবল প্রশিক্ষণের নতুন কাঠামো। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা অপরিহার্য। তাই তিনি সবসময় জোর দিতেন প্রযুক্তি ও প্রশাসনের যুগপৎ উন্নয়নে।
তাঁর নেতৃত্বে টেলিফোন বোর্ডের কার্যক্রম কেবল সরকারি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং শিল্প, ব্যবসা ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও টেলিযোগাযোগ ব্যবহারের প্রসার ঘটে। এভাবেই তিনি দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে টেলিকম ব্যবস্থাকে কার্যকর উপকরণে পরিণত করেন।
এ. বি. এম. তাহের ছিলেন একজন চিন্তাশীল ও বাস্তবমুখী প্রশাসক। সহকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন কঠোর কিন্তু ন্যায্য নেতা হিসেবে। কাজের ক্ষেত্রে তিনি শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন, তবে অধস্তন কর্মকর্তাদের প্রগতি ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে ছিলেন সদা উৎসাহী। তাঁর অধীনে কাজ করা অনেক কর্মকর্তা পরবর্তীতে দেশের টেলিকম খাতের নেতৃত্বে আসেন—যা তাঁর প্রভাব ও দিকনির্দেশনারই প্রতিফলন।
দীর্ঘ সরকারি সেবাজীবন শেষে অবসর গ্রহণের পরও তিনি থেমে থাকেননি। বরং তাঁর অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ এখনো মূল্যবান হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে তিনি তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির বিকাশে অবদান রাখছেন।
ব্যক্তিজীবনে এ. বি. এম. তাহের ছিলেন বিনয়ী, শিষ্টাচারসম্পন্ন ও দেশপ্রেমিক মানুষ। সরকারি জীবনে যেমন তিনি শৃঙ্খলা ও সততার প্রতীক ছিলেন, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন একজন নৈতিক, পরোপকারী ও মানবিক মননের মানুষ।
এ. বি. এম. তাহেরের জীবনগাথা শুধু একজন প্রশাসকের কর্মযাত্রা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন—দূরদর্শিতা, জ্ঞান ও দায়িত্ববোধ মিললে যেকোনো খাতেই স্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব।
Last modified: অক্টোবর ১৩, ২০২৫