বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে যে কয়েকজন ব্যক্তিত্ব তাঁদের কাজ, নীতি ও সাহসিকতার মাধ্যমে প্রজন্মকে পথ দেখিয়েছেন, এ. বি. এম. মুসা তাঁদের অন্যতম। ১৯৩১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ফেনীতে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির কর্মযাত্রা শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি উপমহাদেশের রাজনৈতিক উত্তাল সময়ে সত্য ও সাহসের ধারক সাংবাদিকতার এক অনন্য দলিল। দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের পেশাজীবনে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম—সবখানেই তিনি রেখে গেছেন এক অমলিন ছাপ। সাংবাদিকতা, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম প্রশাসন থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর দক্ষতা, সততা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।

এ. বি. এম. মুসা ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর শিক্ষাজীবন কেটেছে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লা—উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রে। তিনি চট্টগ্রাম গভর্নমেন্ট মুসলিম হাই স্কুল, নোয়াখালী জিলা স্কুল ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে চৌমুহনী কলেজে অধ্যয়ন করতে গিয়ে তাঁর জীবনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়—এখানেই কলেজ ম্যাগাজিন ‘কৈফিয়ত’–এর সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতার প্রথম অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। এই সময়েই তাঁর ভাষা, চিন্তা ও বিশ্লেষণ দক্ষতা বিকশিত হতে থাকে, যা পরবর্তী জীবনের পেশাগত উৎকর্ষের ভিত্তি রচনা করে।

মুসার পেশাগত সাংবাদিকতা শুরু হয় ১৯৫০ সালে, তৎকালীন দৈনিক ইনসাফ–এ যোগদানের মাধ্যমে। একই বছর তিনি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার–এও যোগ দেন, যেখানে তাঁর প্রতিভা দ্রুতই নজরে আসে। প্রখর বিশ্লেষণশক্তি, ভাষার সাবলীল ব্যবহার এবং খবরের গভীরে প্রবেশের ক্ষমতা তাঁকে দ্রুত স্বতন্ত্র সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

তিনি ছিলেন পাকিস্তান জার্নালিস্টস ইউনিয়নের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান জার্নালিস্টস ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয় এবং সেই সময়ের কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থানে ছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে এ. বি. এম. মুসা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন গঠনের অন্যতম কার্যকর কণ্ঠ ছিলেন। তিনি বিবিসিসানডে টাইমস–এর প্রতিনিধি হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র, পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা এবং বাঙালির সংগ্রাম বিশ্বের সামনে তুলে ধরেন।

তাঁর পাঠানো রিপোর্টেজ, বিবরণ ও সাক্ষাৎকার আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে মুসার অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সাহসী রিপোর্টিং নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। নবগঠিত রাষ্ট্রের গণমাধ্যম কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং জাতীয় টেলিভিশনকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি মর্নিং নিউজ–এর সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন—যা সেই সময় গুরুত্বপূর্ণ একটি ইংরেজি ভাষার দৈনিক ছিল।

১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সংবাদের জাতীয় বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)–এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর নেতৃত্বে সংস্থাটি আধুনিকতা, শৃঙ্খলা ও নির্ভরযোগ্য সংবাদ পরিবেশনে নতুন মানদণ্ড তৈরি করে।

২০০৪–০৫ সালে তিনি দৈনিক যুগান্তর–এর সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকাটি ধারালো প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ এবং সৎ সাংবাদিকতার জন্য বিশেষ পরিচিতি পায়।

১৯৭৩ সালে ফেনী-২ আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর রাজনীতি ছিল গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের পক্ষে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পক্ষে।

মুসার ব্যক্তিজীবন ছিল পরিমিত, পরিশীলিত এবং পরিবারনির্ভর। তাঁর স্ত্রী সেতারা মুসা ছিলেন একজন দক্ষ সাংবাদিক ও লেখক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার্স করা সেতারা মুসা দৈনিক জনতা, দৈনিক আওয়াজ এবং দৈনিক পূর্বসংবাদ–সহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। তাঁদের এক ছেলে এবং তিন কন্যা সন্তান রয়েছে—নাসিম মুসা, মারিয়াম সুলতানা মুসা রুমা, পারভিন সুলতানা মুসা ঝুমা এবং ড. শারমিন মুসা।

এ. বি. এম. মুসা ছিলেন ও থাকবেন বাংলাদেশের সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক নন; ছিলেন একজন চিন্তাশীল লেখক, সংগঠক, গণমাধ্যম নির্মাতা এবং মূল্যবোধের প্রতি অবিচল এক মানুষ। সাহস, নিষ্ঠা, সততা এবং পেশাদারিত্ব—এই চার গুণ তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর লেখনী, তাঁর প্রভাব এবং তাঁর আদর্শ আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের পথ দেখাবে।

প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন

সূত্র: wikipedia

প্রিন্সিপাল আবুল কাসেম : বাঙালির প্রেরণা

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window