এক প্রজ্ঞাবান প্রশাসক, মেধাবী শিক্ষার্থী ও আন্তর্জাতিক মানসিকতার রাষ্ট্রকর্মী, যিনি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে অম্লান নাম রেখে গেছেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি পর্বে ফুটে ওঠে অধ্যবসায়, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের অনন্য মেলবন্ধন।

১৯২৫ সালে নোয়াখালীর পরশুরাম উপজেলার সুবার বাজার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। এক শিক্ষানুরাগী ও সমাজসম্মানিত পরিবারে বেড়ে ওঠা শফদার শৈশব থেকেই ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী। তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল সাফল্যগাঁথায় পূর্ণ। ১৯৪০ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে বৃত্তিসহ ‘স্টার মার্ক’ নিয়ে উত্তীর্ণ হন—যা সে সময়ের এক বিরল অর্জন। পরবর্তীতে তিনি বিজ্ঞানের জগতে পা রাখেন এবং রসায়নে অনার্স সম্পন্ন করে ১৯৪৬ সালে এম.এস.সি. পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। তাঁর একাডেমিক সাফল্য তাঁর জীবনদর্শনের প্রতিফলন—নিষ্ঠা, নির্ভুলতা ও উৎকর্ষের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি।

শিক্ষাজীবন শেষে এ. বি. এস. শফদার যোগ দেন তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোয়। প্রশাসনিক কাজে তিনি দ্রুতই নিজের দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও সৎ চরিত্রের জন্য সহকর্মী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আস্থা অর্জন করেন। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তাঁর লক্ষ্য ছিল দেশ ও জনগণের সেবা, এবং সেই পথেই তিনি এগিয়ে যান একে একে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে।

১৯৫৪ সালে তিনি কানাডায় উচ্চতর প্রশাসনিক কোর্সে অংশগ্রহণ করেন। বিদেশে এই প্রশিক্ষণ তাঁকে আন্তর্জাতিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে গভীর ধারণা দেয়। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে তিনি লন্ডনে সচিব পর্যায়ের উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, যা তাঁকে আরও পরিণত ও নীতি-নির্ধারণে দক্ষ করে তোলে। তাঁর এই প্রশিক্ষণ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোকে আধুনিকায়ন ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বহুমাত্রিকতা। তিনি সরকারের উচ্চ প্রশাসনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং প্রতিটি দায়িত্বেই রেখেছেন এক অবিচ্ছিন্ন ছাপ। প্রশাসনিক নীতি বাস্তবায়ন, জনকল্যাণমুখী প্রকল্প ব্যবস্থাপনা এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ে তিনি ছিলেন এক অভিজ্ঞ ও দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক। ১৯৮৩ সালে অবসর নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু তাঁর কর্মনিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার কারণে অবসর-পরবর্তী সময়েও তিনি প্রশাসনিক মহলে আলোচিত ও শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

১৯৭১ সালে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, তিনি আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ইউ.এস.এইড (USAID) পাবলিক সেফটি কোর্সে অংশগ্রহণ করেন। এটি ছিল এক বিশেষ প্রশিক্ষণ, যেখানে প্রশাসনিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নীতি বাস্তবায়নের কৌশল শেখানো হতো। তাঁর এই অভিজ্ঞতা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রশাসনিক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জনাব শফদার শুধু একজন আমলা ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী পরিকল্পনাবিদ। তিনি রাষ্ট্রপতির ‘ইন্সপেকশন ব্যুরো’-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তাঁর কাজ ছিল প্রশাসনিক তদারকি, শৃঙ্খলা রক্ষা ও কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন। পরে তিনি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক পদেও অধিষ্ঠিত হন, যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তাঁর গভীর আস্থা ও দক্ষতারই প্রতিফলন।

তাঁর আন্তর্জাতিক ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৮ সালে তিনি টোকিওতে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো সেমিনারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের শিক্ষাগত ও কারিগরি খাতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্পর্ক সুদৃঢ় করার এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাঁর কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ও স্পষ্ট বক্তব্যে বাংলাদেশের অবস্থান সেখানে মর্যাদার সঙ্গে প্রতিফলিত হয়।

তাঁর কূটনৈতিক জীবন এখানেই থেমে থাকেনি। বিভিন্ন সময় তিনি সরকারের জাতীয় প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন। এইসব আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে তিনি সবসময় বাংলাদেশের উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার ও শিক্ষা-বৃত্তিমূলক সহযোগিতা বিষয়ে শক্ত অবস্থান তুলে ধরেছেন।

জনাব এ. বি. এস. শফদার ছিলেন ইসলামিক সেন্টার ফর টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ (ICTVTR)-এর পরিচালকমণ্ডলীর সভাপতি। তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি মুসলিম বিশ্বের কারিগরি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, দক্ষ মানবসম্পদই একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ। তাই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব—এ ছিল তাঁর নীতিগত দর্শন।

অবসর-পরবর্তী সময়েও জনাব শফদার থেমে থাকেননি। তিনি সমাজসেবায় নিজেকে নিবেদিত করেন এবং ঢাকাস্থ বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে সমিতিটি পরিণত হয় একটি সক্রিয় সমাজকল্যাণ সংগঠনে, যা নোয়াখালীর উন্নয়ন, শিক্ষা ও মানবিক উদ্যোগে ভূমিকা রাখছে।

ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন বিনয়ী, শিষ্টাচারসম্পন্ন ও চিন্তাশীল। সহকর্মীরা তাঁকে স্মরণ করেন একজন নীতিনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে, যিনি কোনো প্রলোভনে নীতির বাইরে যাননি। কর্মক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কঠোর কিন্তু ন্যায্য, এবং অধীনস্থদের জন্য ছিলেন দিকনির্দেশক ও অভিভাবকের মতো।

এ. বি. এস. শফদারের জীবন যেন এক জীবন্ত শিক্ষা—যেখানে প্রতিটি ধাপে আছে জ্ঞান, নিষ্ঠা, সেবা ও দেশপ্রেমের অটল বার্তা। একাধারে প্রশাসক, শিক্ষক, কূটনীতিক ও সমাজনেতা—এই চার গুণের মিশ্রণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

 

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window