ঐতিহ্যবাহী নলদিয়া মেলা
নলদিয়া মেলা বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী লোকমেলা, যা বৃহত্তর নোয়াখালীর ফেনী-নোয়াখালী মিলনস্থলে দাগনভূঞা উপজেলার ইয়াকুবপুর ইউনিয়নের চণ্ডিপুর গ্রামে অবস্থিত দেওয়ান আবদুর রশিদ সাহেবের মাজারকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হতো।
ঐতিহাসিকভাবে, এই মেলাটি প্রতি বছর ১লা মাঘ (১৫ই জানুয়ারী) থেকে শুরু হয়ে মাসব্যাপী চলত। এটি ফেনী ও নোয়াখালী জেলার সীমান্তবর্তী স্থানে হওয়ায় দুই জেলার মানুষের কাছেই এটি খুব জনপ্রিয় ছিল।
নলদিয়া মেলা অনুষ্ঠিত হতো নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নের নলদিয়া গ্রামে এবং ফেনী জেলার দাগণভূঞা উপজেলার চন্ডিপুর গ্রাম। তার সাথে রয়েছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা। মোট ৩টি উপজেলার মিলনস্থলে এই মেলা অনুষ্ঠিত হতো।
মেলা মূলত নলদিয়া দরগাহ (সুফি মাজার)-কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। তিনি হলেন ইয়েমেন থেকে আগত হাফেজ দেওয়ান আব্দুর রশিদ (র) সাহেব। ধারণা করা হয় ইনি হলেন সে ৩৬০ আউলিয়ার একজন যারা হযরত শাহ জালাল (র) এর সাথে এদেশে ধর্ম প্রচার করতে এসেছিলেন। এবং তার ওফাত দিবস থেকে এই মেলার যাত্রা শুরু হয়। তাতে ধারণা করা হয় এই মেলার বয়স কয়েকশত বছর। কমপক্ষে ৬শ বছর। যদিও তা কোনো ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়না। তবে এলাকার বয়োজোষ্টরা বলেন, তারা তাদের বাপ দাদার কাছে এই মেলার ব্যাপারে শুনেছেন এমনকি তারাও তাদের বাপ দাদার কাছ থেকে শুনে আসছেন।
অন্য একটি বর্ণনামতে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এক ওলিয়ে কামেল ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এ অঞ্চলে আগমন করেন। পরবর্তীতে হাফেজ দেওয়ান ফকির আবদুর রশিদ (রহ.) সেখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করা শুরু করেন এবং তার দীক্ষায় বহু মানুষ সেখানে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার মৃত্যুর পর মুরিদানরা ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রথমবারের মত বার্ষিক ওরস মাহফিলের আয়োজন করে। ওরশ মাহফিলকে ঘিরে সেখানে দোকান পাট বসতে থাকে এবং দু’তিন বছরের মাথায় সেটি মেলায় রূপান্তরিত হয়।
তবে এলাকার স্থানীয় বয়োবৃদ্ধ লোকেরা বলেন তারা তাদের বাপ দাদার কাছে এই মেলার কথা শুনেছেন। সম্ভবত ১৯২৩ সালে কোনো সূত্রে এই মেলার বর্ণনা সর্বপ্রথম লিখিত আকারে পাওয়া যেতে পারে।
একসময় এই ব্যাপ্তি আয়তন একসময় বড় ছিল: ১০–১৫ দিনের মেলা হিসেবে ছিল, আবার কিছু সময় এক মাসব্যাপী করা হতো। এবং আয়তন ১ বর্গ কিলোমিটারের বেশী হতো।
অতীতে মেলায় লাখ লাখ মানুষ আসে — বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ জড়ো হতেন। “শিশুর দোলনা থেকে মৃতের পালঙ্ক, সব কিছুই মেলায় মেলা জিনিস থাকে” — এমন জনপ্রিয় ধারণা ছিল। ব্যবসায়ীরা দূর-দূরান্ত থেকে তাঁদের পণ্য নিয়ে আসতেন: কাঠ-ফার্নিচার, বড় মাছ, মিষ্টি, সরকরের মতো পণ্য মেলায় বিক্রি হতো। এমনও কথিত ছিল যে মেলায় আসা অনেকের জন্য “বাপের বাড়ি-শ্বশুরবাড়ি যাওয়া” মেলার অংশ ছিল, পারিবারিক মিলনস্থান হিসেবে কাজ করতো। মেলা উপলক্ষ্যে জামাইরা শ্বশুর বাড়ি আসতো বড় মাছ নিয়ে আসা একটি রুসুম বা আচার হিসেবে পরিচিত। নানারকম মিষ্টি নিয়ে বেহাইর বাড়িতে যেতো। বাড়ির বউ ঝিদের নাইওর হতো এই মেলাকে কেন্দ্র করে। বৌকে বাপের বাড়িতে যাওয়ার জন্য দিতো শ্বশুর বাড়ির লোকজন। এছাড়া মেয়ের বাড়ি থেকে মেলা থেকে মিষ্টান্ন ও মৌসুমী ফল পাঠাতে হতো স্বামীর বাড়িতে। এটা একটি সামাজিক প্রথা ছিল বলা যায়।
মেলাতে কি ব্যবসা হতো? তারচেয়ে বড় কথা হলো তারচেয়ে বড় কথা কি ব্যবসা হতো না। সেলুন থেকে মাটির হাড়ি, খেলনা থেকে কসমেটিক্স, ফার্নিচার থেকে বড় বড় হোটেল। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হতো। কয়েক কিলোমিটার এলাকার মানুষ সারা বছর টাকা জমাতো মেলা উদযাপনের জন্য। স্থানীয় অনেকের জীবিকাও ছিল মেলা নির্ভর।
মেলায় ভোগ্যপণ্য ও সেবার সাথে সাথে ছিল নানারকম বিনোদন। যেমন যাত্রাপালা, পুতুল নাচ, সার্কাস এসবও বাংলাদেশ আমলে প্রচলিত হয়। শেষে দিকে জুয়া ও হাউজি প্রচলিত হওয়ার পর মেলার সুনাম নষ্ট হতে থাকে। এমনকি ১৯৮০ সালের পর মেলায় ব্যাপক গণডাকাতি ও যাত্রাশিল্পীদের উপর পাশবিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটার পর থেকে মেলার জৌলুস কমতে থাকে। তাছাড়া রাজনৈতিক চাঁদাবাজি মেলাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।
বিগত কয়েক বছর মেলাটি বন্ধ হয়ে গেছে। জেলা প্রশাসক ও আইনশৃঙ্খলা সমস্যা (চুরি, গ্যাং, অপরাধ) এবং অনুমতির অভাব একটি বড় কারণ ছিল বলে জানা যায়। মদ ও জুয়ার আসর, এবং ভেরাইটি শো নাম “অশ্লীল নৃত্য”-সংক্রান্ত অভিযোগও উঠেছিল, যা প্রশাসনিক ও সামাজিক বিরোধ সৃষ্টি করেছিল। এছাড়া দুটি গ্রুপের মধ্যে জমি-মালিকানার বিরোধ থাকার কথাও বলা হয় — একজন গ্রুপ মেলার ভূমি দাবি করেছিল। কারণ ধানী জমিতে মেলা হলেও মেলা কমিটি গঠন করে তারা স্টল এর জন্য টাকা আদায় করতো কিছু স্থানীয় প্রভাবশালী।
ঐতিহাসিকভাবে, মেলা শুধুমাত্র ধর্মীয় মেলা ছিল না — এটি বাণিজ্য মেলা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদিও পরে সেটা বিনোদন কেন্দ্রীক হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেলা “বিলুপ্তির পথে” রয়েছে।
এমনও বলা হচ্ছে যে, প্রশাসনিকভাবে মেলা পুনর্আয়োজনে এখনো ব্যর্থতা রয়েছে — অনুমোদন, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমর্থন নিয়ে সমস্যা আছে। আসলে এতবড় মেলা সামাল দেয়ার মতো সামর্থ্য স্থানীয় প্রশাসনের নেই। বিশেষ করে রাজনৈতক কলুসতা ও সামাজিক নিরাপত্তা দূর্বল হওয়ার পর এটি একটা ইস্যু হয়ে গেছে বটে।
লোকজন দূর থেকে আসতো; মেলা পারিবারিক মিলন, পুরাতন সম্পর্ক পুনঃসংযোগ এবং সামাজিক বিনিময়-স্থল হিসেবে কাজ করতো। যদি স্থানীয় সরকার, ধর্মীয় সংস্থা এবং ব্যবসায়ীরা একত্রে কাজ করে, তাহলে এই মেলার পুনরায় যাত্রা সম্ভব — এটি ঐতিহ্য ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্য=
পত্র পত্রিকা: দৈনিক ফেনী, প্রবাসির দিগন্ত, Bdmorning.com
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
Last modified: নভেম্বর ২২, ২০২৫