মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার ওবায়েদ উল্যা: নোয়াখালীর ভাঙনরোধের অদম্য স্বপ্নদ্রষ্টা
নোয়াখালী জেলার ইতিহাসে উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে যে নামটি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়, তিনি মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার ওবায়েদ উল্যা। মেঘনা নদীর করালগ্রাস থেকে নোয়াখালীকে রক্ষার সংগ্রামে তাঁর অবদান এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তিনি শুধু অবিভক্ত বাংলার প্রথম মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারই নন, বরং তৎকালীন ভারতবর্ষের একমাত্র মুসলিম মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
১৮৭৬ সালে নোয়াখালী জেলার সুধারাম থানার সল্লাঘটিয়া (সল্যাঘটাইয়া) গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা মুন্সি রমজান আলী এবং মাতা জামিলা খাতুন। শৈশব থেকেই তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। পুরাতন জেলা শহরের একটি স্কুলে অধ্যয়নকালে ইংরেজ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বিশেষ স্নেহ প্রদর্শন করেন এবং পরবর্তীতে বরিশালে বদলি হলে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে বরিশাল জেলা স্কুলে ভর্তি করান। সেখান থেকে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন।
পরবর্তীতে তিনি ভারতের শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হন এবং প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে কৃতিত্বের সঙ্গে ফাইনাল পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন। সেই ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের সহযোগিতায় তিনি ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে খনিজ ও প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হয়ে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বি.এসসি ডিগ্রি অর্জন করেন—যা সে সময়ের জন্য বিরল অর্জন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ভারতের ভূপালে সুপরিচিত শাতয়ালেস কোম্পানিতে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীতে স্বাধীন ভূপাল রাজ্যে জিওলজিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অসাধারণ দক্ষতার কারণে খুব দ্রুতই তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। মাটি পরীক্ষা করে খনিজ সম্পদের অবস্থান নির্ধারণে তাঁর অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। কর্মজীবনে তিনি গ্যাস, হীরা, কয়লা, ম্যাঙ্গানিজ, মাইলস্টোনসহ বিভিন্ন খনিজের খনি আবিষ্কার করেন।
এই খ্যাতির সূত্রে ১৯১৯ সালের দিকে আফগানিস্তানের বাদশাহ আমানুল্লাহ তাঁকে উচ্চ বেতনে নিয়োগ দেন। সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ১৯২৯ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাদশাহ সিংহাসন ত্যাগ করলে ওবায়েদ উল্যা নিজ জন্মভূমি নোয়াখালীতে ফিরে আসেন।
দেশে ফিরে তিনি এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হন—মেঘনা নদীর তীব্র ভাঙনে নোয়াখালী শহরের বহু অংশ এবং মোঘল আমলের স্থাপত্য নিদর্শন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তিনি ভাঙনরোধে একটি সুপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের সেচ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁর পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। কিন্তু তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের প্রধান প্রকৌশলী স্যার ওয়েস উইলিয়াম (বা স্যার এডওয়েস) তাঁর এই পরিকল্পনাকে অসম্ভব বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
তবুও তিনি দমে যাননি। নিজের পরিকল্পনার প্রতি অটল আস্থা রেখে কয়েক হাজার শ্রমিক নিয়ে তিনি নিজ উদ্যোগে শহরের ভাঙনমুখে আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ শুরু করেন। প্রায় ৪০ ফুট উঁচু এই বাঁধ নির্মাণের ফলে মেঘনার প্রবল স্রোত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে ভাঙন অনেকাংশে রোধ হয়। এটি ছিল মানব ইচ্ছাশক্তি, দূরদর্শিতা ও সাহসের এক অনন্য উদাহরণ।
যদিও পরবর্তীতে একটি প্রভাবশালী কুচক্রী মহল সেই বাঁধ কেটে দিলে নদীর উত্তাল স্রোতে নোয়াখালী শহর শেষ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি এবং ১৯৪৯ সালে শহরটি মাইজদীতে স্থানান্তরিত হয়, তবুও উপকূলীয় অঞ্চলে বর্তমান যে বেড়িবাঁধ ব্যবস্থা বিদ্যমান, তার ধারণাগত ভিত্তি ও প্রেরণা ওবায়েদ উল্যার এই উদ্যোগ থেকেই এসেছে।
প্রশাসনিক দায়িত্বেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি নোয়াখালী পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং জেলা বোর্ডের সদস্য ছিলেন। তাঁর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ওবায়েদ উল্লাহ মেমোরিয়াল হাই স্কুল’।
১৯৩৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, মাত্র ৬০ বছর বয়সে তিনি নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জীবন একদিকে যেমন একজন মেধাবী প্রকৌশলীর সাফল্যের গল্প, তেমনি অন্যদিকে একটি জনপদের অস্তিত্ব রক্ষায় নিবেদিত এক সাহসী স্বপ্নদ্রষ্টার অনন্য দৃষ্টান্ত।
Last modified: এপ্রিল ১৭, ২০২৬