কবি রেজাউল হক হেলাল দেশ থেকে দেশান্তরে
দাগনভূঞা উপজেলার আলমপুর গ্রামের সন্তান কবি ও লেখক রেজাউল হক হেলাল বর্তমানে বিশ্বব্যাপী দাওয়াতি অভিযাত্রীর পরিচিত নাম। তিনি ১৯৬৩ সালে ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার আশরাফপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও মানবসেবার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। শিক্ষাজীবনের প্রাথমিক ধাপ গ্রামেই শেষ করেন।
রেজাউল হক হেলাল পরবর্তীতে সোনাগাজীর আলী আজম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।
এরপর তিনি ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে অধ্যয়নকালে তার চিন্তা, লেখালেখি ও দাওয়াতি ধারা আরও সুদৃঢ় হয়। জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তিনি ইসলামী জ্ঞান, গবেষণা এবং আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েন, যা পরে তার কাজ ও জীবনের মূল দিক নির্দেশনা হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলাম ছাড়াও নানাবিধ বিষয়ে রয়েছে তার লেখার হাত বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি দীর্ঘদিন যাবত লেখালেখি করেছেন। তার লেখায় নিজস্ব চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ পাঠককে স্পর্শ করে সহজেই। শব্দের গাথুনি ও সাবলীল প্রকাশ তার লেখাকে করেছে শানিত।
দাওয়াতি ও ধর্মীয় জীবন
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করেন আলীয়া মাদ্রাসা থেকে দাওয়াতি কার্যক্রমর সঙ্গে। জীবনের ৪০ বছরের বেশি সময় তিনি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলাম ও মানবতার আলো ছড়িয়ে কাটিয়েছেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশ এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে তার গূণমূগ্ধ ভক্তরা।
অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের ফিজি আইসলেন্ড, ভানুয়াটু, কিংডম অব টোঙা, সলোমন আইসলেন্ড, সামোয়া, তাবিউনি ইত্যাদি প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ দ্বীপান্তরে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেন। কিছুটা ইবনে বতুতার মতো দেখতে এই কবি বাংলার পাশাপাশি আরবি, উর্দু, ইংরেজি, হিন্দি ভাষায় বক্তৃতা করেন। ভারতবর্ষে দশ বছর আরব দেশ সমুহে ১২ বছর এবং ওশেনীয় অস্ট্রেলিয়ান দেশে তিন বছর দাওয়াতি কাজে আত্মনিয়োগ করেন
তিনি মসজিদ-মাদ্রাসাভিত্তিক দাওয়াতি কার্যক্রমে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি নানা জায়গায়— সেমিনার, নফারেন্স, সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ, ইসলামী আলোচনার আয়োজন— এ সবই করেছেন গভীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায়। তিনি নিয়মিত কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক শিক্ষা ছড়িয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
বিদেশযাত্রা ও আন্তর্জাতিক দাওয়াতি কাজ
মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করার লক্ষ্যে হেলাল বিশ্বের বহু দেশে ভ্রমণ করেছেন।
সংবাদে উল্লেখ রয়েছে— তিনি ১৫টি দেশে ইসলামের দাওয়াত প্রচার করেছেন। সেই দেশগুলোতে তিনি মুসলিম সম্প্রদায় ও বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে ইসলামী আলোচনা, সেমিনার, লেকচার ও মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে তিনি ইসলামের আলো ছড়িয়েছেন। তার দাওয়াতি কার্যক্রম সাধারণ মানুষের হৃদয়ে বিশ্বাস ও আস্থা জাগিয়েছে।
লেখালেখি ও সৃজনশীলতা
তবে রেজাউল হক হেলালের পরিচয়ের আরেকটি শক্তিশালী দিক হলো তার কবিতাচর্চা।
সংবাদ অনুযায়ী— তিনি ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ লিখেছেন। তার রচনাগুলো মূলত ইসলাম, মানবতা, সমাজ সংস্কার, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার ওপর ভিত্তি করে।
তার কবিতা পাঠকের হৃদয়ে নৈতিক জাগরণ সৃষ্টি করে এবং সমাজ উন্নয়নে অনুপ্রেরণা জোগায়। বাংলা সাহিত্যের একজন শক্তিমান লেখক হিসেবে তিনি ছড়া কবিতা ভ্রমণসহ বিভিন্ন রকমের সাহিত্য রচনায় মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তার লেখা ‘‘মরু দিগন্তের কান্না’’ পাঠকের মনকে ছুঁয়ে যায় বার বার।
তার রচিত কিছু বই
নবজাতকের রক্তক্ষরণ, মরু দিগন্তে কান্না, চিরায়ত কিশোর কবিতা, ভোরের বাতাস, দি নিউ এপ্রোজ অব কোরআন, তাবলীগ জামাত কি খন্ডিত ইসলাম ইত্যাদি।
মানবিক সেবা ও সমাজকল্যাণ
হেলালের কর্মজীবন শুধু দাওয়াতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি একজন মানবসেবী হিসেবেও সুপরিচিত।
তিনি— গরিব–দুঃখীর পাশে দাঁড়ানো, চিকিৎসা সহযোগিতা, খাদ্য সহায়তা, পোশাক বিতরণ, শিক্ষা-উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা— এসব কাজ নীরবে-নিভৃতে করে যাচ্ছেন। প্রতিবেদনে লেখা আছে, তার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করছেন। স্কুল ও পাঠাগারসহ নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠান সৃষ্টিতে রয়েছে তার ধারাবহিক অবদান।
স্বপ্নবাজ প্রতিভা কবি হেলাল ২০১৬ সালে বেকের বাজারে ” কবি হেলাল একাডেমি ” নামে স্কুল চালু করেন। ২০২৪ সালে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ফিজি আইসলেন্ড ও ভানুয়াটু দেশে দুটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠান চালু করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
জীবনদর্শন ও ব্যক্তিত্ব
রেজাউল হক হেলাল অত্যন্ত বিনয়ী, সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত এবং দাওয়াতকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে ধারণ করেন। তিনি সর্বদা কুরআন–সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ার পরামর্শ দেন এবং সমাজে নৈতিক উন্নয়ন ঘটাতে কাজ করে যাচ্ছেন। মানবিক আদর্শ, নৈতিক মূল্যবোধ, বিনয়ী এই মানুষটি আজীবন ইসলামের সেবা করেছেন যখন যেভাবে সুযোগ পেয়েছেন।
তার আলোচনার মূল বিষয়— ঈমান, নৈতিকতা, মানবিকতা, সমাজ সংস্কার, ইসলামী আদর্শে ফিরে আসার আহ্বান তার জীবনধারা অনুসরণযোগ্য এবং প্রজন্মকে সৎপথে পরিচালনার জন্য অনুপ্রেরণা।
তার মাতা দিলবাহারের বয়স ১০৫ বছর। মাকে দেখতে সূদুর অস্ট্রেলিয়া থেকে ৪ নভেম্বর ২০২৫ বাংলাদেশ ছুটে আসেন। তিনি প্রচার বিমুখ এবং দলছুট প্রজাপতির মতোই দেশ বিদেশে শান্তির বাণী পৌঁছে দিতে চেষ্টা রত। ভানুয়াটু দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে তার হাতে ইসলাম গ্রহনের পর মিডিয়ায় আসেন। তিনি একাধিক দেশের সন্মানিত সিটিজেন ও বটে।
দাগনভূঞার সাধারণ এক গ্রাম থেকে উঠে এসে রেজাউল হক হেলাল আজ বিশ্বমঞ্চে ইসলামের দাওয়াতের একজন সম্মানিত প্রতিনিধি। লেখালেখি, কবিতা, সমাজসেবা ও দাওয়াতি কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে তিনি বহু মানুষকে আলোকিত করেছেন। তার জীবন হলো সত্যের আহ্বান, মানবতার পথে চলা এবং সমাজকে সঠিক পথে পরিচালনা করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সূত্র: পত্রিকা, লেখকের বইয়ের ভূমিকা ও রেজাউল হক হেলালের সাথে কথোপকথন থেকে
Last modified: নভেম্বর ২২, ২০২৫