১৯৩২ সালে ফেনীর মাটিতে জন্মগ্রহণ করা কাজী ফজলুর রহমান ছিলেন একাধারে প্রশাসক, শিক্ষক, লেখক ও সমাজসেবী—একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ। তাঁর পিতা কাজী সিদ্দিক আহমদ ছিলেন শিক্ষানুরাগী ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি, যাঁর প্রেরণায় ফজলুর রহমান ছোটবেলা থেকেই শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার শিলুয়া গ্রামে। সেই গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

শিক্ষাজীবনের শুরু ফজলুর রহমানের দাগনভূঁইয়া আতাতুর্ক হাই স্কুলে। সেখান থেকেই তিনি মেট্রিকুলেশন পাস করেন কৃতিত্বের সঙ্গে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা করেন সিলেটের এম.সি. কলেজে, যেখানে তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে গভীর আগ্রহ দেখান। পরবর্তীতে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে—তখনকার সময়ের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে। তিনি পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে ১৯৫২ সালে প্রথম শ্রেণিতে বি.এসসি. (অনার্স) এবং ১৯৫৩ সালে প্রথম শ্রেণিতে এম.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন। এই দুই ডিগ্রিই তাঁর অসামান্য মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচায়ক হয়ে ওঠে।

শিক্ষা জীবনের পরপরই ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। তবে শিক্ষাজীবনের সীমা তিনি এখানেই টানেননি। ১৯৫৫ সালে উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানে লন্ডন স্কুল অব ইকনমিকস (LSE) থেকে পোষ্টগ্রাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ ট্রিনিটি কলেজে আরও উচ্চশিক্ষা নেন। তাঁর শিক্ষাযাত্রা এখানেই শেষ হয়নি—পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হারভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (লোক প্রশাসন) এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। বলা যায়, জ্ঞানার্জনের প্রতি তাঁর তৃষ্ণা ছিল সীমাহীন।

১৯৫৬ সাল কাজী ফজলুর রহমানের জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। সেই বছর তিনি সিএসপি (Civil Service of Pakistan) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন—যা তখনকার সময়ের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাফল্য। সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর তিনি দেশজুড়ে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পটুয়াখালী মহকুমার প্রশাসক হিসেবে কাজের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরে সিলেট জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে প্রশাসনিক দক্ষতা ও মানবিক নেতৃত্বের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

পরবর্তীতে তিনি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন—তেল ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়ের সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বহিঃসম্পদ (পররাষ্ট্র) মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে। প্রতিটি দায়িত্বেই তিনি সততা, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে কাজ করে গেছেন। তাঁর পরিকল্পনা ও নীতি বাস্তবায়নের দক্ষতা তাঁকে দ্রুতই দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (Asian Development Bank)–এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রমে কার্যকর দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। প্রশাসনিক জীবন শেষে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনে সদস্য হিসেবে, যেখানে তাঁর অভিজ্ঞতা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কাজী ফজলুর রহমান শুধু প্রশাসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক চিন্তাশীল সমাজমনস্ক মানুষ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও সেমিনারে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি ছিলেন হাওয়াইয়ের ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের ফেলো এবং বিশ্বব্যাংকের কনসালট্যান্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। এইসব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য।

সমাজসেবামূলক কাজেও তিনি ছিলেন অগ্রণী। বিশেষ করে শিশু ও নারী উন্নয়নমূলক উদ্যোগে তাঁর অবদান ছিল প্রশংসনীয়। সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য ইউনিসেফ তাঁকে পুরস্কৃত করে—যা তাঁর মানবিক দিকের স্বীকৃতি বহন করে।

লেখালেখির প্রতি তাঁর ঝোঁকও ছিল শৈশব থেকেই। প্রশাসনিক ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি সময় বের করে লিখেছেন তিনটি উল্লেখযোগ্য বই—‘যাত্রী’, ‘দর্পণে প্রতিবিম্ব’ এবং ‘ষোলই ডিসেম্বর ও মুক্তিযুদ্ধের গল্প’। এই বইগুলোয় তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, দেশের মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ ও মানুষকে দেখা তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর লেখনীতে প্রশাসনিক কঠোরতা নয়, বরং মৃদু মানবিক সুর ও গভীর দেশপ্রেমের ছাপ পাওয়া যায়।

ব্যক্তিগত জীবনে কাজী ফজলুর রহমান ছিলেন বিনয়ী, অধ্যবসায়ী ও নীতিনিষ্ঠ। সহকর্মী ও অধীনস্তদের কাছে তিনি ছিলেন একজন পরামর্শদাতা ও পিতৃতুল্য ব্যক্তি। তাঁর প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল দূরদর্শী—যেখানে উন্নয়ন ও মানবিকতার মেলবন্ধন ঘটেছিল।

আজ কাজী ফজলুর রহমানের জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, সততা ও মেধা থাকলে একজন মানুষ দেশের ভেতর ও বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই সম্মানের সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে পারে। তাঁর কর্মজীবন শুধু প্রশাসনিক পদমর্যাদার ইতিহাস নয়, বরং এক আলোকিত জীবনের প্রতিচ্ছবি—যা তরুণ প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবে প্রজ্ঞা, দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধে উজ্জীবিত হতে।

বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় যাঁরা নেপথ্যে থেকে নিরলস পরিশ্রম করেছেন, কাজী ফজলুর রহমান তাঁদেরই একজন। তাঁর নাম উচ্চারণ করলে মনে পড়ে এক পরিশ্রমী, চিন্তাশীল, এবং দেশপ্রেমিক প্রশাসকের কথা—যিনি তাঁর প্রতিটি কাজে দেশের কল্যাণকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window