বাংলাদেশের ইতিহাস-সাহিত্যে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাদের নিবেদন ও অনুসন্ধানী মনোভাবের কারণে কোনো অঞ্চল, জনপদ কিংবা সংস্কৃতির অতীত আজ আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নোয়াখালীর ইতিহাসের ক্ষেত্রেও তেমন এক নাম হলো কাজী মোজাম্মেল হক। তিনি শুধু একজন গবেষক নন, ছিলেন একান্তভাবে নিবেদিতপ্রাণ ইতিহাস অনুরাগী, যিনি জীবনের ব্যস্ত কর্মজীবনের মধ্যেও তাঁর এলাকার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর লেখা ‘হাজার বছরের নোয়াখালীর ইতিহাস’ ও ‘ইতিহাসের রূপরেখা ফেনী’—এই দুটি গ্রন্থ আজ নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলের ইতিহাস গবেষণার অপরিহার্য সূত্রগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত।

কাজী মোজাম্মেল হক ১৯৩৯ সালে তৎকালীন নোয়াখালীর অন্তর্গত ফেনী অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ফেনীর সুপরিচিত আইনজীবী মরহুম কাজী ফজলুল হক, যিনি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার জন্য সমাজে বিশেষ সম্মান অর্জন করেছিলেন। পারিবারিকভাবে শিক্ষানুরাগ ও সামাজিক দায়িত্ববোধের যে ঐতিহ্য, তা ছোটবেলা থেকেই তাঁকে প্রভাবিত করে। শিশুকাল থেকেই ইতিহাস, ভূগোল ও সাহিত্য বিষয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় ফেনীতেই। সেখানকার শিক্ষা পরিবেশ ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণায় তিনি মনোযোগী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি ফেনী কলেজ থেকে বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন এবং স্থানীয় পত্রিকায় ছোট ছোট প্রবন্ধ প্রকাশ করতে শুরু করেন। তাঁর লেখাগুলোর মূল বিষয় ছিল ফেনী ও নোয়াখালীর ইতিহাস, নদীভাঙন, জনপদ পরিবর্তন ও সামাজিক জীবন।

শিক্ষা সমাপ্তির পর ১৯৬৩ সালে কাজী মোজাম্মেল হক যোগ দেন আই.ডব্লিউ.টি.এ (Inland Water Transport Authority)-তে। সেখানে কাজ করার সময় তিনি প্রশাসনিক দক্ষতা ও নিষ্ঠার প্রমাণ দেন। এক বছর পর, ১৯৬৪ সালে তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান-এ চাকরি নেন। যদিও আর্থিক খাতে তাঁর কর্মজীবন সংক্ষিপ্ত ছিল, এই সময়েই তিনি প্রশাসনিক কাঠামো ও দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর ধারণা লাভ করেন।

পরবর্তীতে, ১৯৬৫ সালে তিনি খাদ্য বিভাগে (Food Department) যোগ দেন, যেখানে তাঁর কর্মজীবন দীর্ঘ সময়জুড়ে বিস্তৃত হয়। তিনি বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেন এবং সর্বশেষ সেনবাগ উপজেলার খাদ্য কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সরকারি চাকরির কঠোর দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি ইতিহাসচর্চা চালিয়ে যান, যা তাঁর ব্যক্তিত্বের এক বিশেষ দিক প্রকাশ করে।

কাজী মোজাম্মেল হক মূলত ইতিহাস গবেষণায় গভীরভাবে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘ইতিহাসের রূপরেখা ফেনী’ ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশের পর স্থানীয় গবেষক সমাজে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। এতে তিনি ফেনী অঞ্চলের ভূগোল, সামাজিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক ইতিহাস, নদী ও জনপদের বিবর্তনকে দলিলসম্মতভাবে তুলে ধরেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি আরও বৃহত্তর পরিসরে নোয়াখালীর ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। দীর্ঘ গবেষণা, সাক্ষাৎকার, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ সংগ্রহের মাধ্যমে তিনি লেখেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হাজার বছরের নোয়াখালীর ইতিহাস’। বইটি নোয়াখালীর রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের এক অমূল্য ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত।

তাঁর লেখার ধরণ ছিল তথ্যনির্ভর, তবে একইসঙ্গে সাহিত্যিক বর্ণনায় ভরপুর। ইতিহাসের শুষ্ক তথ্যকে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করতেন যে পাঠক যেন এক ধারাবাহিক জীবন্ত কাহিনি পড়ছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো এলাকার ইতিহাস জানলেই তার মানুষ ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে বোঝা যায়।

কাজী মোজাম্মেল হক বিশ্বাস করতেন—নিজ এলাকার ইতিহাস সংরক্ষণই জাতির বৃহত্তর ইতিহাস সংরক্ষণের অংশ। তাঁর লেখায় একদিকে যেমন দেখা যায় গবেষণার গভীরতা, অন্যদিকে প্রকাশ পায় স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি অগাধ মমত্ববোধ।
তিনি তরুণ প্রজন্মকে ইতিহাস জানার জন্য উৎসাহিত করতেন এবং প্রায়ই বলতেন,

“নিজেকে জানার শুরু হয় নিজের মাটি থেকে; তাই নোয়াখালীকে জানতে হলে জানতে হবে তার হাজার বছরের ইতিহাস।”

তাঁর গবেষণায় নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, নদীবিধৌত ভূমির গঠন, প্রাচীন জনপদের বিকাশ, উপনিবেশকালীন প্রশাসনিক পরিবর্তন—সবই সুচারুভাবে স্থান পেয়েছে।

যদিও কাজী মোজাম্মেল হক পেশায় সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, তাঁর আসল পরিচয় আজ একজন ঐতিহাসিক গবেষক ও লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর লেখা বই দুটি—‘ইতিহাসের রূপরেখা ফেনী’ এবং ‘হাজার বছরের নোয়াখালীর ইতিহাস’—নোয়াখালী অঞ্চলের সামাজিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে মৌলিক উৎস হিসেবে গণ্য হয়। স্থানীয় ইতিহাস রচনায় তাঁর এই অবদান পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।

বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণ গবেষক ও লেখক তাঁর রচনাকে ভিত্তি করে নোয়াখালীর ইতিহাস নিয়ে নতুন নতুন গবেষণা করছেন। তাঁকে বলা যায় নোয়াখালীর এক নিবেদিত ঐতিহাসিক যিনি সরকারি চাকরির পাশাপাশি নিজের সময়, শ্রম ও ভালোবাসা উৎসর্গ করেছেন নিজের মাতৃভূমির ইতিহাস রচনায়।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window