বাংলাদেশের নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁরা একাধিক ক্ষেত্রে অবদান রেখে চিরস্থায়ী ছাপ রেখেছেন। কামরুজ্জামান মিলন ছিলেন সেই ধরনের একজন প্রতিভাধর মানুষ—যিনি নাট্য, সংগীত, চলচ্চিত্র এবং সরকারি সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন।
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলন জন্মগ্রহণ করেন ১৬ নভেম্বর ১৯৩৪ সালে, পুরাতন নোয়াখালী শহরের মহত্বতপুরে। তাঁর বর্তমান পৈতৃক নিবাস নোয়াখালী সদর উপজেলার হরিনারায়নপুর গ্রামে। পিতা মরহুম বজলুল হক ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। শৈশব থেকেই মিলনের আগ্রহ ছিল নাট্য, সংগীত এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।
মিলন শিক্ষার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রতিভাধর ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. ডিগ্রী অর্জন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন, যা তাঁর পরবর্তীতে নাট্য ও চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
কামরুজ্জামান মিলনের নাট্যচর্চার শুরু হয় সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে, যা তাঁকে মঞ্চে এবং চলচ্চিত্রে প্রবেশের সুযোগ দেয়। নাট্য অভিনয়ে তাঁর প্রথম হাতে খড়ি দেন অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি সেক্রেটারি খলিল আহমদ, যিনি খ্যাতনামা অভিনেতা বুলবুল আহমদের পিতা।
মিলনের প্রথম মঞ্চ নাটক ছিল ‘কংকাবতীর ঘাট’ (১৯৫৩)। এরপর তিনি নিয়মিতভাবে নাটকে অভিনয় শুরু করেন এবং ঢাকা বেতার ও টিভিতে ১৯৭২-৭৪ সাল থেকে নিয়মিত নাটক পরিবেশন করেন।
মিলন ১৯৬১ সালে প্রথম নাটক পরিচালনা করেন এবং পরবর্তী সময়ে প্রায় শতাধিক নাটক মঞ্চায়ন করেন। তাঁর পরিচালনা দক্ষতা নাট্য জগতে প্রশংসিত হয়েছিল।
চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন ১৯৬৭ সালে ‘গুর্ণিঝড়’ নাটকের মাধ্যমে। এরপর তিনি নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতে সমানভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। নাট্যচর্চা, অভিনয় এবং পরিচালনার সংমিশ্রণে মিলন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একজন বহুমুখী প্রতিভাধর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
নাট্য ও চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মিলন সরকারি সেবাতেও কর্মরত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে তিনি নথি পরীক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যোগদান করেন। তাঁর দক্ষতা ও দায়িত্ববোধের কারণে পরবর্তীতে তিনি তত্বাবধায়ক (প্রশাসন) হিসেবে পদোন্নতি পান।
মিলন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ৩০ এপ্রিল ১৯৯০ পর্যন্ত আপিল বিভাগের তত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি সেবা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড একত্রিত করে তিনি দেশের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
কামরুজ্জামান মিলন একজন বহুমুখী প্রতিভাধর ব্যক্তি—যিনি নাট্য, সংগীত, চলচ্চিত্র এবং সরকারি সেবার ক্ষেত্রে সমান দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। তাঁর নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা এবং নিষ্ঠা তাকে শিক্ষার্থী, সহকর্মী এবং শিল্পীসহ সকলের কাছে সম্মানজনক ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তাঁর অভিনয়, পরিচালনা এবং সংগীত দক্ষতা নতুন প্রজন্মের নাট্য ও চলচ্চিত্রশিল্পীদের জন্য শিক্ষণীয়। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, শিল্প, সংস্কৃতি এবং পেশাগত দায়িত্ব একত্রে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।
কামরুজ্জামান মিলন বাংলাদেশের নাট্য, চলচ্চিত্র এবং সরকারি সেবা ক্ষেত্রে এক প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে, নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা একত্রে একজন ব্যক্তিকে যুগান্তকারী অবদানের জন্য প্রস্তুত করতে পারে।
মঞ্চে নাট্য, স্টুডিওতে চলচ্চিত্র এবং অফিসে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন—সব ক্ষেত্রে মিলনের অবদান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্থায়ী চিহ্ন রেখেছে। তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ২০, ২০২৫