কামাল আহমেদ মজুমদার ১৯৫০ সালের ৩ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ফেনী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদ এবং ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। মজুমদার বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ছাত্রজীবন থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মজুমদারের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। ১৯৯৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মিরপুরে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ মোহসিনের কাছে পরাজিত হন।
২০০২ সালে বিএনপি সরকারের আমলে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে, এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে তিনি হয়তো নির্যাতনের শিকার হতে পারেন।
২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৫ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন, যেখানে তিনি বিএনপি প্রার্থী মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। এরপর তিনি ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ধারাবাহিকভাবে পুনর্নির্বাচিত হন।
তিনি জাতীয় সংসদের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন এবং ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চতুর্থ মেয়াদে শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এই দায়িত্বে থেকে তিনি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উন্নয়ন, শিল্পায়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং স্থানীয় উদ্যোক্তা বিকাশে ভূমিকা রাখেন।
রাজনীতির পাশাপাশি মজুমদার একজন উদ্যোক্তা হিসেবেও পরিচিত। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মোহনা টিভি-এর চেয়ারম্যান। এছাড়া তিনি মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে তাকে একাধিকবার বিতর্কের মুখে পড়তে হয়।
কামাল আহমেদ মজুমদারের রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি রয়েছে নানা বিতর্ক ও সমালোচনার ইতিহাস।
-
সাংবাদিক নির্যাতন: ২০১২ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে আরটিভির সাংবাদিক অপর্ণা সিংহ ও ক্যামেরাম্যান সৈয়দ হায়দারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
-
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন: ২০১৩ সালে নির্বাচন কমিশন তাকে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের দায়ে জরিমানা করে।
-
অবৈধ আদালত প্রতিষ্ঠা: ২০১৪ সালে তিনি মিরপুরে তার অফিসে “সামাজিক ন্যায়বিচার কমিটি” নামে একটি তথাকথিত আদালত গঠন করেন, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষায় সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল।
-
দুর্নীতির অভিযোগ: তাঁর স্ত্রী শাহিদা মজুমদারকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে।
২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবর ভোরে কামাল আহমেদ মজুমদারকে পুলিশ গুলশান থেকে গ্রেপ্তার করে। ছাত্র ইকরামুল হক হত্যাকাণ্ডের মামলায় তাকে জড়িত করা হয়। ১৯ অক্টোবর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত তাকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠান। এই মামলা ২০২৪ সালের আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের সময় ঘটে যাওয়া একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হয়।
কামাল আহমেদ মজুমদার বিবাহিত এবং তাঁর স্ত্রীর নাম শাহিদা মজুমদার। তাঁদের একমাত্র পুত্র জিয়াউদ্দিন আহমেদ মজুমদার জুয়েল ছিলেন মোহনা টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তবে ২০০২ সালে জুয়েলকে মোবাইল ব্যবসায়ী শিপু হত্যার দায়ে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০১৭ সালের ২৯ মে জুয়েল মৃত্যুবরণ করেন।
কামাল আহমেদ মজুমদার বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রভাবশালী ও বিতর্কিত চরিত্র। একদিকে তিনি আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক নেতা, অপরদিকে তার জীবন জুড়ে রয়েছে নানা বিতর্ক, সমালোচনা ও আইনি জটিলতা। শিল্প মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার অবদান যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি সাংবাদিক নির্যাতন, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনাগুলোও তাকে আলোচনায় রেখেছে।
সত্তরের দশকের রাজনীতি থেকে ২০২৪ সালের ঘটনাপর্যন্ত কামাল আহমেদ মজুমদারের জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে—যেখানে নেতৃত্ব, ক্ষমতা, বিতর্ক ও ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প একত্রে মিশে আছে।
Last modified: নভেম্বর ৮, ২০২৫