ফেনীর রামগঞ্জ উপজেলার দশঘরিয়া গ্রামে ১৯১৮ সালের ১১ জুন জন্মগ্রহণ করেছিলেন কৃষ্ণ বন্ধু নাথ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অধ্যবসায়ী ও জ্ঞানপিপাসু। শিক্ষার প্রতি তার অনুরাগ ছিল অনন্য—যা পরবর্তী জীবনে তাকে একজন প্রতিভাবান ও নিবেদিত শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় চাটখিলের পাচগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে, যেখানে তিনি বিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর তিনি চৌমুহনী মদন মোহন হাই স্কুল এবং খিলপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় নয় বছর শিক্ষকতা করেন। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে বোঝার এবং তাদের প্রতিভা উন্মোচনের জন্য তিনি বিশেষ যত্ন নিতেন।

শিক্ষাজগতে ৩৭ বছরের দীর্ঘ কর্মজীবনের পর ১৯৬১ সালে তিনি আতাতুর্ক হাইস্কুলে যোগদান করেন। এখানে তিনি বিশ বছর ধরে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং কিছু সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বওভার গ্রহণ করেন। আতাতুর্ক হাইস্কুলে তার নেতৃত্ব এবং দায়িত্বনিষ্ঠা শিক্ষকদের মধ্যে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

কৃষ্ণ বন্ধু নাথ ছিলেন বিজ্ঞানের শিক্ষক হলেও তার জ্ঞান শুধুমাত্র বিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গণিত, ইংরেজি, বাংলা, ভুগোল, অর্থনীতি এবং যুক্তিবিদ্যা—প্রায় সব বিষয়েই গভীর পান্ডিত্য প্রদর্শন করতেন। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা তাকে স্মরণ করে বলেন, কে বি নাথ বাবু শুধু ছাত্রদের শিক্ষক নন, শিক্ষকদেরও শিক্ষক।” তাঁর এই বহুমুখী জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা ও সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছিল।

শিক্ষক হিসেবে তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল দায়িত্বপরায়ণতা, সততা এবং নিয়মানুবর্তিতা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র জ্ঞান দেওয়া নয়, বরং ছাত্রদের চরিত্র গঠন করা। সেই নীতি অনুযায়ী তিনি অনেক শিক্ষার্থীকে জীবন জুড়ে সৎ ও দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

শিক্ষাজগতে তার অবদানের কারণে স্থানীয় সমাজ তাকে সর্বদা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে। তার ছাত্ররা পরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নামকরা ব্যক্তি হন, তাদের মধ্যে অনেকেই তাকে জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

কৃষ্ণ বন্ধু নাথ ১৯৮৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চিরশান্তিতে বিদায় নেন। তার মৃত্যুতে শিক্ষা জগতে একটি বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। তবে তার দীক্ষা, শিক্ষাদর্শন এবং চরিত্র শিক্ষার মূল্য আজও অনুপ্রাণিত করছে নতুন প্রজন্মকে। কৃষ্ণ বন্ধু নাথের জীবন আমাদের শেখায় যে, একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষাদানকারী নয়, বরং সমাজ গঠনেরও প্রেরণার উৎস।

আজও আতাতুর্ক হাইস্কুল এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার আদর্শ ও নীতি জীবন্ত—যা প্রতিটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে শ্রদ্ধা ও অনুপ্রেরণায় ভরিয়ে রাখে। কৃষ্ণ বন্ধু নাথের অবদান স্মরণীয়, চিরকাল শিক্ষার অমর প্রেরণারূপে দাঁড়িয়ে থাকবে।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window