নোয়াখালীর মাটিতে জন্ম নেওয়া ক্ষীতিশ চন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অনন্য সাহসী কর্মী। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় জড়িয়ে আছে সংগ্রাম, ত্যাগ এবং আন্দোলনের ইতিহাস। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেন। এই আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছিল।
স্বদেশী আন্দোলন ও গুপ্ত সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা
ক্ষীতিশ চন্দ্র রায় চৌধুরী কৈশোর থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। নোয়াখালীতে তখন গুপ্ত সমিতির গোপন কার্যক্রম চলছিল। ক্ষীতিশ চন্দ্র সক্রিয়ভাবে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করার জন্য এ ধরনের গোপন বিপ্লবী সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
১৯১৪ সালে নোয়াখালীর নরেন্দ্র ঘোষ চৌধুরী ও ক্ষীতিশ চন্দ্রের বিরুদ্ধে ডাকাতি, খুন ও বৃটিশবিরোধী ষড়যন্ত্রের মামলা দায়ের করা হয়। বিচারে ক্ষীতিশ চন্দ্র খালাস পেলেও নরেন্দ্র ঘোষ চৌধুরী যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তবে কিছুদিন মুক্ত অবস্থায় থাকার পর ক্ষীতিশ চন্দ্রকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযোগ ছিল—আইবি ইনফরমার শিরীষ চন্দ্র রায় চৌধুরীকে হত্যার সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন। এ অভিযোগে তিনি প্রায় ছয় বছর কারাভোগ করেন।
দীর্ঘ কারাজীবন ও আন্দোলনে প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ ছয় বছর আলীপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকার পর ১৯২০ সালে তিনি মুক্তি পান। কিন্তু কারামুক্তির পরও তাঁর আন্দোলনী জীবন থেমে থাকেনি। খেলাফত আন্দোলনের সময় আইন অমান্য করার অভিযোগে আবারও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বারবার কারাগারে গিয়েও তিনি স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াননি।
কারামুক্তির পর তিনি জনসাধারণের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে “কৃষক সমিতি” নামে নতুন একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সংগঠনের সভাপতি ছিলেন জনাব ফজলুল্লাহ (চুন্নুমিয়া) এবং ক্ষীতিশ চন্দ্র রায় চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য এই সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি ও সম্পাদকীয় ভূমিকা
ক্ষীতিশ চন্দ্র রায় চৌধুরী প্রথম জীবনে কংগ্রেস কর্মী হিসেবে কাজ করলেও পরবর্তীকালে গুপ্ত সমিতি এবং কমিউনিস্ট পার্টির সাথেও যুক্ত হন। তিনি ছিলেন নোয়াখালী কংগ্রেসের সেক্রেটারি এবং একসময় “দেশের বানী” পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠত জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং গণমানুষের অধিকার নিয়ে দৃঢ় অবস্থান।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলা
১৯৩০ সালে যখন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযান সংঘটিত হয়, তখন ক্ষীতিশ চন্দ্র রায় চৌধুরীকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। স্বাধীনতার জন্য এই আন্দোলনে তাঁর সংশ্লিষ্টতা ব্রিটিশ সরকারকে আতঙ্কিত করেছিল। ফলে তাঁকে একাধিকবার বন্দি করা হয়।
গান্ধীর লবণ আন্দোলনে অংশগ্রহণ
ক্ষীতিশ চন্দ্র রায় চৌধুরী শুধু আঞ্চলিক আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, সর্বভারতীয় আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি গান্ধীজীর নেতৃত্বে গঠিত “লবণ আইন অমান্য কমিটি”-র সেক্রেটারি ছিলেন। লবণ আইন অমান্য করার অপরাধে নোয়াখালীর হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হলে তাঁদের সঙ্গে ক্ষীতিশ চন্দ্রকেও বন্দি করা হয়। জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে নামার এই দৃষ্টান্ত তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও আপন করে তোলে।
স্বাস্থ্য ভেঙে পড়া ও জীবনের শেষ অধ্যায়
দীর্ঘকাল অনবরত জেল খাটার কারণে ক্ষীতিশ চন্দ্র রায় চৌধুরীর শারীরিক স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। মানসিকভাবেও তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন। তবে তাঁর সংগ্রামী চেতনা নিভে যায়নি। আজীবন তিনি জাতির মুক্তির স্বপ্ন দেখেছেন।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। যদিও তিনি স্বাধীন ভারতের দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক পর্ব দেখতে পাননি, তবুও তাঁর আত্মত্যাগ এবং সংগ্রামী ভূমিকা স্বাধীনতার আন্দোলনের ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছে।
ক্ষীতিশ চন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন একাধারে কংগ্রেস কর্মী, বিপ্লবী, সম্পাদক, কৃষক সংগঠক এবং আন্দোলনের এক নির্ভীক সৈনিক। তাঁর বারবার কারাবরণ, কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলা, গুপ্ত সমিতির নেতৃত্ব এবং গান্ধীজীর লবণ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় স্থান দিয়েছে।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন, স্বাধীনতার সংগ্রাম শুধু অভিজাত শ্রেণির নয়, বরং সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়েই তা সফল করতে হয়। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম তাই আজও অনুপ্রেরণা জোগায়, বিশেষ করে স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৩, ২০২৫