ফেনীর ফুলগাজীর সন্তান আনসার আলী ছিলেন একাধারে প্রশাসক, সংগঠক ও সমাজসেবক। কর্মজীবনে তিনি সততা, দক্ষতা এবং কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চপদে আসীন হন এবং অবসরের পরও সমাজ ও জাতির কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যান।
শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের শুরু
আনসার আলী উচ্চশিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। ১৯২০ সালে কলকাতার খ্যাতনামা রিপন কলেজ থেকে তিনি বি.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করেই তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ পান। ১৯২২ সালে অবিভক্ত বাংলার সেক্রেটারিয়েট সার্ভিসে যোগদান করেন। প্রশাসনিক দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও সততার কারণে তিনি দ্রুতই কর্তৃপক্ষের আস্থা অর্জন করেন।
প্রশাসনিক জীবনে সাফল্য
ক্রমে পদোন্নতি পেতে পেতে আনসার আলী ১৯৪২ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি সেক্রেটারির পদে উন্নীত হন। এটি ছিল তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। ব্রিটিশ আমলের একজন বাঙালি মুসলমান হিসেবে এমন পদে পৌঁছানো ছিল অনেক বড় সম্মানের বিষয়। তিনি দীর্ঘদিন সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৫৫ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
অবসরের পরের কর্মযজ্ঞ
অবসর গ্রহণের পরও আনসার আলী থেমে থাকেননি। দেশ ও জাতির উন্নয়নে নতুনভাবে আত্মনিয়োগ করেন। আজাদীর পরবর্তী সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে আনসার বাহিনী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন এবং তা বাস্তবায়ন করেন। এই প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ জনপদে শৃঙ্খলা রক্ষা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাঁর সামাজিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ববোধ এখানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি পাকিস্তান জাতীয় চাকুরী বোর্ডের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। পাশাপাশি সাবেক পূর্ব পাকিস্তান যানবাহন কর্তৃপক্ষের সদস্য এবং বয়স্ক শিক্ষা সমিতির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনি নোয়াখালী সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন, যা তাঁর জন্মভূমি ও মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ বহন করে।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি
আনসার আলীর কর্ম ও অবদান সরকারিভাবেও স্বীকৃত হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার সমাজসেবামূলক কার্যক্রম ও প্রশাসনিক দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে “খান বাহাদুর” উপাধি প্রদান করে। পরবর্তীকালে পাকিস্তান সরকারও তাঁর অবদানের মূল্যায়ন করে তাঁকে “তমঘায়ে পাকিস্তান” খেতাবে ভূষিত করে। এই দুই স্বীকৃতি তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
ব্যক্তিত্ব ও অবদান
আনসার আলীর ব্যক্তিত্বে ছিল শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও কর্মপ্রেম। তিনি শুধু চাকরিজীবী হিসেবেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং অবসর গ্রহণের পরও সমাজের নানা উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। বিশেষ করে আনসার বাহিনী প্রতিষ্ঠা তাঁর দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বগুণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সাধারণ মানুষকে সংগঠিত না করলে সমাজের নিরাপত্তা ও অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি জনগণকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করেছিলেন। একইসঙ্গে শিক্ষার প্রসারেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন, যা প্রমাণ করে তিনি ছিলেন বহুমুখী অবদানকারী এক সেবক।
খান বাহাদুর আনসার আলী ছিলেন এক আদর্শ প্রশাসক ও সমাজসেবক, যিনি কর্মজীবন ও অবসর–দুই পর্যায়েই দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর অবদান শুধু প্রশাসনিক পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে তিনি যে কর্মযজ্ঞের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা আজও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
খান বাহাদুর আনসার আলী প্রশাসক ফেনীর ফুলগাজীর সংগঠক ও সমাজসেবক
Last modified: অক্টোবর ১০, ২০২৫