বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী থেকে তিন দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তিনি শুধু দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীই নন, বরং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক যাত্রায় তিনি ছিলেন আন্দোলনের নেত্রী, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, আবার বন্দী ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুও।
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, তৎকালীন বৃটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেন খালেদা খানম ‘পুতুল’। তাঁর পৈতৃক নিবাস ফেনীর ফুলগাজীতে। ব্যবসায়ী ইস্কান্দার আলী মজুমদার ও গৃহিণী তায়েবা মজুমদারের পাঁচ সন্তানের তৃতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহের মাধ্যমে তিনি ‘খালেদা জিয়া’ নামে পরিচিতি পান।
শিক্ষাজীবনে খালেদা জিয়া নিজেকে ‘স্বশিক্ষিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি দিনাজপুর মিশনারি স্কুল ও দিনাজপুর গার্লস স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হলেও স্বামীর পোস্টিংয়ের কারণে পড়াশোনা অসম্পূর্ণ রেখে তাঁকে পশ্চিম পাকিস্তানে যেতে হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন দুই সন্তান তারেক ও আরাফাত রহমানকে নিয়ে। পাকিস্তানি সেনারা তাঁর অবস্থান জানতে পেরে ২ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় আটক রাখে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বন্দি থাকার পর ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি পান তিনি।
স্বামীর হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ সালে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন জারির পর তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৩ সালে বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সাতদলীয় জোট গঠন করেন এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বে পরিণত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এই সময়ে তাঁর সরকার সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে ১২তম সংশোধনী পাস করে। প্রাথমিক শিক্ষা বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক ঘোষণা এবং মেয়েদের দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা তাঁর সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছিল।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) চালু, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বেসরকারিকরণ বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ঢাকার কাছে নতুন এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন গড়ে তোলেন।
দ্বিতীয় মেয়াদে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বিরোধীদল বর্জন করলেও, পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৩তম সংশোধনী পাস করে নির্বাচন দেন তিনি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে, আর খালেদা জিয়া দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে সংসদে প্রবেশ করেন।
২০০১ সালে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাপা (এরশাদ) ও ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে গঠিত চারদলীয় জোট আবার ক্ষমতায় আসে। তৃতীয় মেয়াদে তাঁর সরকারের সময় দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল গড়ে ৬ শতাংশের ওপরে, রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ বিলিয়ন ডলারে, এবং বিদেশি বিনিয়োগও তিনগুণ বৃদ্ধি পায়।
বিদেশনীতি ও আঞ্চলিক সম্পর্ক উন্নয়নে ‘লুক ইস্ট পলিসি’ গ্রহণ করে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে মনোযোগ দেন। তাঁর সরকারের সময় বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম অবদানকারী দেশে পরিণত হয়।
তবে এই সময়েই আন্তর্জাতিক দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশ টানা পাঁচ বছর ‘সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়। রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা ও দলীয় সংঘর্ষও বেড়ে যায়।
২০০৬ সালে মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে সহিংসতা শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট ইজ্জুদ্দিন আহমেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন, তবে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটেনি। পরবর্তীতে সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতা নেয় এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তিনি যেমন ছিলেন আন্দোলনের প্রতীক, তেমনি রাজনৈতিক বিতর্কেরও কেন্দ্রবিন্দু। আজও বাংলাদেশের গণতন্ত্র, রাজনীতি ও ইতিহাসে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় দৃঢ়তা ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে।
Last modified: নভেম্বর ৩, ২০২৫