গান্ধী আশ্রম নোয়াখালী জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটি জেলা সদর মাইজদী কোর্ট থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে, সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ বাজার সংলগ্ন সড়কের পাশে অবস্থিত। মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিবিজড়িত এই আশ্রমটি তৎকালীন জমিদার ও নোয়াখালীর প্রথম ব্যারিস্টার প্রয়াত হেমন্ত কুমার ঘোষের বাড়িতে স্থাপিত হয়। বর্তমানে এটি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সারা দেশব্যাপী সুপরিচিত।
সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা ও গান্ধীর নোয়াখালী আগমন
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৪৬ সালের শেষভাগে সারা ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রভাব এসে পড়ে নোয়াখালী অঞ্চলেও। বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক তাণ্ডব শুরু হয়। মশালের আগুনে পুড়ে যায় অসংখ্য সাজানো সংসার, আর সবুজ জনপদ রক্তে লাল হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে শান্তি মিশনের অগ্রদূত হয়ে নোয়াখালীতে ছুটে আসেন অসহযোগ ও অহিংস আন্দোলনের পুরোধা মহাত্মা গান্ধী। ১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর তিনি চৌমুহনী রেলস্টেশনে প্রথম নোয়াখালীর মাটিতে পা রাখেন।
চৌমুহনী থেকে জয়াগ: গান্ধীর শান্তি পরিক্রমা
মহাত্মা গান্ধীর নোয়াখালী আগমনের পর তৎকালীন এম.এল.এ. শ্রী হারান ঘোষ চৌধুরীর উদ্যোগে চৌমুহনীতে নোয়াখালীর প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় গান্ধীজি প্রথম বক্তৃতা দেন। এরপর তিনি দত্তপাড়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় একের পর এক জনসভা ও শান্তি প্রচার চালান।
এই ধারাবাহিক শান্তি পরিক্রমার একপর্যায়ে ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ গ্রামে এসে পৌঁছান।
গান্ধী আশ্রম প্রতিষ্ঠা ও সম্পত্তি দান
জয়াগ গ্রামে আগমনের দিনই নোয়াখালী জেলার প্রথম ব্যারিস্টার ও জয়াগ গ্রামের কৃতী সন্তান হেমন্ত কুমার ঘোষ তাঁর জমিদারির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়ের উদ্দেশ্যে মহাত্মা গান্ধীর নামে উৎসর্গ করেন। এই লক্ষ্যেই তিনি আম্বিকা কালিগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও গান্ধী আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে ট্রাস্টের নাম পরিবর্তন করে “গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট” রাখা হয়। আশ্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় গান্ধীজির স্নেহভাজন, জনসেবা ব্রতী ও চিরকুমার শ্রীযুক্ত চারু চৌধুরী মহাশয়ের ওপর। তখন থেকেই এই সম্পত্তির সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে নানা কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে।
বর্তমানে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী (৭২)।
গান্ধী স্মৃতি জাদুঘর
মহাত্মা গান্ধীর অহিংস সমাজব্যবস্থার ধারণা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ২০০০ সালের ২ অক্টোবর গান্ধী আশ্রমের মূল ভবনে গান্ধী স্মৃতি জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। এই জাদুঘরে গান্ধীর বিভিন্ন দুর্লভ ছবি, বই, ব্যবহার্য সামগ্রী এবং তাঁর বৈচিত্র্যময় কর্মজীবনের নিদর্শন সংরক্ষিত আছে, যা দর্শনার্থীদের গভীরভাবে নাড়া দেয়।
দর্শনার্থীদের জন্য সময়সূচী
গান্ধী স্মৃতি জাদুঘর প্রতি সপ্তাহে সোমবার থেকে শনিবার পর্যন্ত সকল দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
কিভাবে যাবেন গান্ধী আশ্রমে
ঢাকার সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে একুশে এক্সপ্রেস, মুনলাইন এন্টারপ্রাইজ ও হিমাচল এক্সপ্রেসের বাসে নোয়াখালীর মাইজদী যাওয়া যায়। এছাড়া ধানমন্ডি জিগাতলা কাউন্টার থেকে একুশে পরিবহনের একটি বাস রাত ১০টা ২০ মিনিটে নোয়াখালীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এসব বাসের নন-এসি ও এসি কোচের ভাড়া সাধারণত ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকার মধ্যে।
মাইজদী থেকে গান্ধী আশ্রম
নোয়াখালী জেলা সদর মাইজদী থেকে সোনাইমুড়ীগামী যেকোনো লোকাল বাস বা সিএনজি অটোরিকশায় জয়াগ বাজারে নামতে হবে। সেখান থেকে রিকশায় বা পায়ে হেঁটে প্রায় আধা কিলোমিটার পূর্বে গেলেই গান্ধী আশ্রমে পৌঁছানো যাবে।
গান্ধী আশ্রম শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, এটি নোয়াখালীর অহিংস আন্দোলন, মানবিকতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জীবন্ত সাক্ষী। ইতিহাস, সমাজসেবা ও মানবিক মূল্যবোধে আগ্রহীদের জন্য গান্ধী আশ্রম নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান।
সুত্র: noakhali.gov.bd, vromonguide.com
নোয়াখালী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার
প্রিয় পাঠক, নোয়াখালী পিডিয়ার সকল কনটেন্ট কপিরাইট করা। এর যেকোনো তথ্য বানিজ্যিক কাজে ব্যবহার আইনত দন্ডনীয়। অন্যকোনো ক্ষেত্রে হবৃুহু কপি করা অনুমতি সাপেক্ষ এবং আংশিক তথ্য ব্যবহার করা সূত্র উল্লেখ সাপেক্ষ বলে বিবেচিত হবে। এছাড়া প্রাথমিক বা নিকটতম সূত্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। সবক্ষেত্রে তথ্যের সূত্র থাকলেও সঠিকতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে একক সূত্র থেকে নেয়া তথ্যের দ্বিতীয় কোনো পর্যালোচনা সম্ভব হয়নি। তাই পাঠকের যেকোনো মতামত, পর্যালোচনা, পরামর্শ, উপদেশ ও সংযোজন বিয়োজনের উপদেশ সাদরে গ্রহণ করা হবে। পাঠন যেকোনো নতুন পুরাতন তথ্য ও সম্পূর্ণ বিষয় নোয়াখালী পিডিয়ার নিকট প্রেরণ করতে পারেন। noakhalipedia@gmail.com, ধন্যবাদ
Last modified: জানুয়ারি ৪, ২০২৬