একজন প্রখ্যাত ব্যাংকার, প্রশাসক ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনাবিদ, যিনি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতিতে যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। তাঁর কর্মজীবন দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ব্যাংকিং সংস্কার এবং নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্মরণীয়।
১৯২০ সালে রায়পুর উপজেলার কেওড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গোলাম মহীউদ্দীন চৌধুরী। পিতা মরহুম সুজাত আলী চৌধুরী ছিলেন সুনামের একজন ব্যক্তি। পরিবারের শিক্ষাব্যবস্থাপনায় প্রভাবিত হয়ে ছোটবেলা থেকেই মহীউদ্দীনের মধ্যে শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মায়। তিনি শিক্ষা জীবনে ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী।
১৯৪২ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে বিএ অনার্সসহ স্নাতক হন এবং পরের বছর, ১৯৪৩ সালে, এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি বেঙ্গল পুলিশ সার্ভিসে যোগ দিয়ে সরকারি সেবা শুরু করেন। তবে তাঁর প্রগতি ও আগ্রহ মূলত অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতে ছিল, যা পরে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।
১৯৪৬ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন উচ্চপদে ব্যাংকিং সেক্টরে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কাজ করেছেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং সোনালী ব্যাংকে। এই সময়ে তিনি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ নীতির প্রবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম আরও সমন্বিত ও কার্যকর হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে দেশের সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন ও আধুনিকীকরণ করতে তার অবদান অপরিসীম। বিশেষত সোনালী ব্যাংকের পূর্ণগঠনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও ব্যাংকিং জ্ঞানের সমন্বয়ে সোনালী ব্যাংক পরিণত হয় দেশের প্রধান সরকারি ব্যাংক হিসেবে, যা স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে।
পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে তিনি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হন। এই সময়ে তিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, যেখানে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও ব্যাংকিং নীতির উন্নয়ন তাঁর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়।
১৯৭৭ সালে তিনি বানিজ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই বছরের মধ্যে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব (ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ) পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি দেশের ব্যাংকিং নীতি, বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং সরকারি খাতের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে সমন্বয় সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৮২ সালে তিনি রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন এবং একই বছর থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত পাবলিক একাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ব্যাংকগুলোতে স্বচ্ছতা, কার্যকারিতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়। দেশের ব্যাংকিং খাতে আধুনিকীকরণ, বিনিয়োগ নীতি উন্নয়ন এবং সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনায় তাঁর অবদান স্মরণীয়।
ব্যক্তিগত জীবনে জনাব মহীউদ্দীন চৌধুরী ছিলেন শিষ্টাচারসম্পন্ন, ন্যায্য ও দূরদর্শী। সহকর্মীরা তাঁকে মনে রাখেন একজন দক্ষ প্রশাসক ও নীতি-নির্ধারক হিসেবে, যিনি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে একনিষ্ঠতা, দক্ষতা এবং সঠিক নেতৃত্বের সমন্বয়ে দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোকে দৃঢ় ও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।
গোলাম মহীউদ্দীন চৌধুরীর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের ব্যাংকিং, অর্থনীতি এবং সরকারি প্রশাসনের ক্ষেত্রে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তাঁর দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্ব দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং ব্যাংকিং খাতের আধুনিকীকরণে স্থায়ী ছাপ রেখেছে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৩, ২০২৫