বাংলাদেশের সাহিত্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যাদের অবদান সময়ের সীমার বাইরে। এমন একজন প্রখর ব্যক্তি হলেন চিত্ত রঞ্জন সাহা, যিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজসেবায়।
চিত্ত রঞ্জন সাহা জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৭ সালে, বেগমগঞ্জ উপজেলার লতিফপুর গ্রামে। তাঁর পিতার নাম কৈলাশ চন্দ্র সাহা। প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন নিজ গ্রামের স্কুলে। শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ এবং বই পড়ার অনুরাগ ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য করা যেত।
-
১৯৪৩: ম্যাট্রিক
-
১৯৪৬: কলকাতা বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আইএসসি
-
১৯৪৮: চৌমুহনী কলেজ থেকে বিএ পাস
ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য ও বই প্রকাশনার প্রতি তাঁর আগ্রহ স্পষ্ট। তিনি পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন।
১৯৫১ সালে চৌমুহনীতে ব্যক্তি মালিকানায় ‘পৃথিঘর’ নামে ক্ষুদ্র পরিসরে পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৭০ সালে সাহিত্য বিষয়ক প্রকাশনার উদ্দেশ্যে ‘পৃথিঘর সাহিত্য সংসদ’ নামে একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাঁর প্রতিষ্ঠান ও বইগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ৫ই মে ১৯৭১ তিনি দেশত্যাগ করে ভারতে যান। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও উদ্দেশ্য অনুসারে বাংলাদেশের শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয় ‘মুক্তধারা’। ২৮শে মে ১৯৭১ ‘মুক্তধারা’ সাহিত্য প্রকাশনী প্রতিষ্ঠিত হয়।
চিত্ত রঞ্জন সাহা তাঁর অর্জিত সমস্ত সম্পদ ‘চিত্তরঞ্জন সাহা জুন কল্যাণ ট্রাস্ট’-এ দান করেছেন। এই ট্রাস্টের তহবিল থেকে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও জাতি গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে বিশেষ পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সক্রিয় ছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
-
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ
-
বাংলা একাডেমী
-
বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ
-
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন
-
বাংলাদেশ ডায়েবেটিক এসোসিয়েশন
-
বাংলাদেশ ভাষা সমিতি
-
বিজ্ঞান সংস্কৃতি পরিষদ
-
জাতীয় দর্শন সেমিনার (রাজশাহী)
-
বংগীয় সাহিত্য পরিষদ (কলকাতা)
-
ফ্রেন্ডস অব ভেলোর (মাদ্রাজ)
-
ফ্রেন্ডস অব হেমারখীথ (লন্ডন)
তিনি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালনা বোর্ডের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
চিত্ত রঞ্জন সাহা মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার, একুশে সাহিত্য পুরস্কার ও আনন্দ পুরস্কার প্রবর্তন করেন। তাঁর এই উদ্যোগের মাধ্যমে সাহিত্যিক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্বীকৃতি পেয়ে থাকেন।
চিত্ত রঞ্জন সাহা ছিলেন একজন দূরদর্শী, উদার ও সংস্কৃতিপ্রেমী ব্যক্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিই মানুষের মন ও জাতির মান উন্নয়নে সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে পারে। তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে এই নীতিমালা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
চিত্ত রঞ্জন সাহার জীবন প্রমাণ করে যে একজন ব্যক্তি কেবল নিজের জন্য নয়, বরং দেশের মানুষের কল্যাণ ও জাতীয় উন্নয়নের জন্যও কাজ করতে পারে। তিনি শুধু সাহিত্যিক ও প্রকাশক নন, বরং একজন সামাজিক নেতা, শিক্ষাবান্ধব উদ্যোক্তা ও সংস্কৃতিপ্রেমী। তাঁর অবদান আজও বাংলাদেশের সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে আলোকবর্তিকা হিসেবে জ্বলে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ২৮, ২০২৫