ছাগলনাইয়া: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের সমৃদ্ধ অধ্যায়
ফেনী জেলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ছাগলনাইয়া উপজেলা। আয়তন ১৩৯.৫৯ বর্গ কিলোমিটার। ভৌগোলিক অবস্থান ২২°৫৪´ থেকে ২৩°০৭´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১°২৬´ থেকে ৯১°৩৫´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। উত্তরে ফুলগাজী, দক্ষিণে মিরসরাই ও ফেনী সদর, পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং পশ্চিমে পরশুরাম ও ফেনী সদর উপজেলা—এই সীমানায় ঘেরা ছাগলনাইয়া তার ঐতিহ্য ও ইতিহাসে অনন্য।
প্রশাসনিক কাঠামো
ছাগলনাইয়া থানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৯ সালে, পরে ১৯৮৩ সালের ১ অক্টোবর এটি উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। ২০০২ সালের ৩ জুন গঠিত হয় পৌরসভা। উপজেলায় রয়েছে ৫টি ইউনিয়ন, ৪৬টি মৌজা ও ৫৮টি গ্রাম।
জনসংখ্যা ও ধর্ম
এ উপজেলার মোট জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৫৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৮৯ হাজার ৪৯৪ এবং মহিলা ৯৭ হাজার ৬৬২। ধর্ম অনুযায়ী মুসলিম ১৮২ হাজার ১৯৩, হিন্দু ৪ হাজার ৮৮৭, বৌদ্ধ ৩৪, খ্রিস্টান ২৫ এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বী ১৭ জন।
শিক্ষা
ছাগলনাইয়ায় গড় শিক্ষার হার ৬৩.৪ শতাংশ। পুরুষদের মধ্যে ৬৫.৩ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে ৬১.৬ শতাংশ শিক্ষিত। উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ছাগলনাইয়া সরকারি কলেজ (১৯৭২), আবদুল হক চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ (১৯৯৫), ছাগলনাইয়া উচ্চ বিদ্যালয় (১৯১৫), এবং পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (১৯৭২)।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
উপজেলায় মসজিদ ২৭৫টি, মন্দির ১০টি এবং মাজার ২টি। চাঁদগাজী ভূঞা মসজিদ, দক্ষিণ বল্লভপুর মসজিদ, পানুয়া পীরের মাজার এবং জগন্নাথ মন্দির এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় স্থাপনা।
সাংস্কৃতিক চর্চাও এখানে সমৃদ্ধ। উপজেলায় রয়েছে ১০টি লাইব্রেরি, ৩৯টি ক্লাব, একটি থিয়েটার গ্রুপ, একটি মহিলা সংগঠন, একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় ও একটি উদ্যান।
ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ
ছাগলনাইয়া মুক্তিযুদ্ধের এক উজ্জ্বল অধ্যায় বহন করে। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে শুভপুর ব্রিজে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে দুই কোম্পানি পাক সেনা নিহত হয়। মে মাসে কালাপুর ও দুর্গাপুর এলাকায় সংঘর্ষে শতাধিক পাক সেনা নিহত হয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শহীদদের স্মরণে এখানে দুটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে।
অর্থনীতি
অর্থনীতির প্রধান উৎস কৃষি। জনসংখ্যার ৩২ শতাংশের বেশি মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া ব্যবসা, চাকরি, রেমিট্যান্স, পরিবহণ, নির্মাণ ও সেবা খাতেও উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান রয়েছে। প্রধান কৃষিপণ্য ধান, আলু, তিল, আখ ও শাকসবজি। ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, কলা, জাম ও আনারস বেশি উৎপাদিত হয়।
শিল্প ও কুটিরশিল্প
এ উপজেলায় রয়েছে চালকল, বরফকল, করাতকল ও ওয়েল্ডিং কারখানা। কুটিরশিল্পের মধ্যে স্বর্ণকারি, কাঠের কাজ, মৃৎশিল্প, লোহার কাজ, সেলাই ও বাঁশের কাজ উল্লেখযোগ্য।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো
ছাগলনাইয়ায় পাকা রাস্তা ১৮০ কিলোমিটার, আধা-পাকা ২৫ কিলোমিটার এবং কাঁচা রাস্তা ৩৫৬ কিলোমিটার। রেলপথ রয়েছে প্রায় ৬ কিলোমিটার। উপজেলায় বিদ্যুৎ সুবিধা পেয়েছে ৮১ শতাংশ পরিবার।
স্বাস্থ্য ও জনসেবা
স্বাস্থ্যসেবার জন্য রয়েছে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, চারটি পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র, তিনটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও চারটি পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, ১৯৬৩ সালের ঘূর্ণিঝড় এবং ১৯৮০ সালের টর্নেডো ছাগলনাইয়ায় ব্যাপক ক্ষতি ডেকে আনে।
সমাজসেবা ও এনজিও কার্যক্রম
উপজেলায় ব্র্যাক, আশা, কেয়ার ও স্বনির্ভর বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি এনজিও কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন
চাঁদগাজী ভূঞা মসজিদ, বাঁশপাড়া জমিদার বাড়ি ও সাত মন্দির, শমসের গাজীর রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ, কৈয়ারা দিঘি ও শিলুয়ার শিল এই এলাকার ইতিহাসকে জীবন্ত রাখছে।
প্রাচীন ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব, কৃষিনির্ভর জীবন ও ক্রমবর্ধমান শিক্ষা-সংস্কৃতির ধারায় ছাগলনাইয়া আজ একটি প্রাণবন্ত ও সম্ভাবনাময় উপজেলা হিসেবে পরিচিত।
সূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, আদমশুমারি রিপোর্ট ২০০১ ও ২০১১; ছাগলনাইয়া উপজেলা সাংস্কৃতিক সমীক্ষা প্রতিবেদন ২০০৭।
এক নজরে সোনাগাজী উপজেলা
Last modified: নভেম্বর ২, ২০২৫