জমীর আলী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একজন সুপরিচিত নাম। তিনি ১৯৪০ সালে রামগতি উপজেলার চর আলেকজান্ডার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৌলভী হারুন অর রশীদ ছিলেন একজন শিক্ষিত ও সমাজসেবী ব্যক্তি, যিনি ছোটবেলা থেকেই জমীর আলীর মানসিক বিকাশ ও শিক্ষাজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। পরিবারের সহায়তায় ও নিজের অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জমীর আলী শিক্ষা ও সামাজিক কাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পথ বেছে নেন।

শিক্ষাজীবন শুরু হয় স্থানীয় স্কুল থেকে, যেখানে তিনি ছোটবেলা থেকেই মেধা ও নেতৃত্বের প্রমাণ দেখিয়েছেন। ১৯৫৮ সালে নোয়াখালী জেলা স্কুলের ছাত্র সংসদের স্কুল ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হওয়া এই নেতৃত্বগুণের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়। এরপর তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৫৯-৬০ সালে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তিনি সহপাঠী ও শিক্ষকদের মধ্যে বিশিষ্ট প্রশংসা অর্জন করেন।

১৯৬৫ এবং ১৯৬৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বি.এ. অনার্স এবং এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে তিনি কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং তিনি জাতীয় ছাত্র আন্দোলন ও ফেডারেশনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৬ সালে জাতীয় ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন তাঁর নেতৃত্বের প্রতি ছাত্র সমাজের আস্থা ও সমর্থন প্রদর্শন করে। ছাত্রনেতা হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল মেধাবী নন, বরং সমস্যা সমাধানে বিচক্ষণ ও দূরদর্শী।

শিক্ষাজীবনের পর জমীর আলী রাজনীতির জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং বর্তমানে মসুলীম লীগ (হুদা জমীর) এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনীতিতে তাঁর অংশগ্রহণ কেবল ক্ষমতা অর্জনের জন্য ছিল না; বরং তিনি দেশের উন্নয়ন, ন্যায্যতা ও জনগণের কল্যাণের জন্য নিবেদিত ছিলেন।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে জমীর আলীর অবদানও অসামান্য। ১৯৬৩ সালে তিনি দৈনিক পয়গাম-এ সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন। সাংবাদিক হিসেবে তিনি সততা, দায়িত্বশীলতা ও সত্যনিষ্ঠার জন্য পরিচিত হন। তাঁর কলম সমাজের দুর্নীতি, অন্যায় ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত তিনি দৈনিক কিষান-এর কার্যনির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮৫ সালে সাপ্তাহিক কণা-এর সম্পাদক হন। এই সময়ে তাঁর নেতৃত্বে পত্রিকাগুলো শুধুমাত্র সংবাদ পরিবেশন করত না, বরং সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়নে সহায়ক বার্তাও প্রদান করত।

বর্তমানে জমীর আলী দৈনিক দিনকাল পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই পত্রিকার মাধ্যমে তিনি দেশে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে সচেতনতা বৃদ্ধি করছেন। সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি জনগণকে তথ্যসমৃদ্ধ ও বিবেচনাশীল করে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। তাঁর বিশ্লেষণাত্মক রিপোর্ট, নিবন্ধ এবং সম্পাদকীয় প্রবন্ধ দেশের সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলো ফেলে।

জমীর আলীর জীবন কেবল সাংবাদিকতা বা রাজনীতির সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নেতৃত্ব, সততা ও দায়িত্বের এক আদর্শ। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার জগতে তিনি সবসময়ই ন্যায্যতা, সততা ও জনসেবাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন মানুষ যদি দৃঢ় মনোভাব, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে, তাহলে সে সমাজে সত্যিকারের প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।

জমীর আলীর জীবন হলো রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতার এক অনন্য সংমিশ্রণ। ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি নেতৃত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন, রাজনৈতিক জীবনে তিনি দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে কাজ করেছেন, আর সাংবাদিকতার মাধ্যমে তিনি সমাজকে তথ্যসমৃদ্ধ ও সচেতন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের ইতিহাসে এক প্রেরণার উৎস হিসেবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window