জয়নাল আবেদীন হাজারী (২৪ আগস্ট ১৯৪৫ – ২৭ ডিসেম্বর ২০২১) ছিলেন বাংলাদেশের একজন রাজনীতিক, সাংবাদিক ও প্রাক্তন সংসদ সদস্য। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর নেতা হিসেবে ফেনী-২ আসন থেকে ১৯৮৬, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
জয়নাল হাজারীর জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৪ আগস্ট ফেনী জেলার ফেনী সদরে। তাঁর পিতার নাম ছিল গনি হাজারী। শিক্ষাজীবনে তিনি ফেনী কলেজে অধ্যয়নকালেই ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ও বিতর্কিত রাজনৈতিক যাত্রা।
জয়নাল হাজারী ১৯৮৪ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ফেনীতে অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং অনেকেই তাঁকে ‘ফেনীর গডফাদার’ বলে আখ্যা দিতেন। তাঁর বিরুদ্ধে নানা সময়ে হত্যা, চাঁদাবাজি ও নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।
১৯৯৩ সালে তিনি নিজ ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিয়ে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করেন। তবে দলের ভেতরে বিরোধের কারণে ২০০৩ সালে তিনি প্রথমবারের মতো দল থেকে বহিষ্কৃত হন এবং ২০০৫ সালে আবারও বিরোধী কার্যকলাপের জন্য তাঁকে বহিষ্কার করা হয়।
২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি ১৬ আগস্ট কলকাতা চলে যান। অনুপস্থিত অবস্থায় তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয় এবং আদালত তাঁকে পাঁচ মামলায় মোট ৬০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তিনি দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করেন এবং জেলহাজতে যান। পরে উচ্চ আদালত তাঁর বেশিরভাগ মামলায় খালাস বা জামিন মঞ্জুর করে।
২০১২ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সাক্ষাৎ করে রাজনীতিতে ফেরার অনুমতি চান। ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে দলের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেন এবং তাঁর চিকিৎসার জন্য ৪০ লাখ টাকা অনুদান প্রদান করেন।
জয়নাল হাজারীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ৪৪টি ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়, যার বেশিরভাগই হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগে।
-
হত্যা মামলা: ১৯৭৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা নাসির হত্যা মামলায় প্রথম কারাবরণ করেন।
-
অস্ত্র মামলা: ২০০১ সালে তাঁর অনুপস্থিতিতে বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার হয়। তাঁকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলেও ২০০৯ সালে উচ্চ আদালত তাঁকে খালাস দেন।
-
অর্থপাচার মামলা: ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অবৈধ সম্পদের অভিযোগে মামলা করে। ২০০৮ সালে আদালত তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন, পরে উচ্চ আদালত খালাস দিলেও ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই রায় বাতিল করে।
-
সাংবাদিক টিপু সুলতান নির্যাতন মামলা: এই মামলাতেও তিনি ২০০৯ সালে জামিন পান।
জয়নাল হাজারী স্থানীয়ভাবে একটি সংবাদপত্র “হাজারিকা” প্রকাশ করতেন। তিনি একাধিক বই রচনা করেন, যার মধ্যে তাঁর আত্মজীবনী “জয়নাল হাজারী বলছি” (২০১০) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী।
নির্বাচিত গ্রন্থসমূহঃ
-
বন্ধন আছে, বিজু কোথায়?
-
বন্ধনের বিচার চাই
-
বিজুর বিচার চাই
-
জয়নাল হাজারী বলছি
জয়নাল হাজারী আজীবন অবিবাহিত ছিলেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি হৃদরোগ, কিডনি ও ফুসফুসজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর, ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
Source : wikipedia
Last modified: নভেম্বর ১৩, ২০২৫