ভাষা আন্দোলনের সাহসী কর্মী ও চলচ্চিত্রের পথপ্রদর্শক

বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এক কালো কিন্তু গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এই দিনে তৎকালীন পাকিস্তানি সরকার ১৪৪ ধারা জারি করেছিল, যাতে ছাত্র ও সাধারণ জনগণ কোনো ধরণের সমাবেশ, মিছিল বা ধর্মঘটে অংশ নিতে না পারে। এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যে সাহসী তরুণেরা রাজপথে নেমেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন জহির রায়হান—একজন বীর যুবক, যিনি পরবর্তীকালে দেশের একজন নামী সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।

জহির রায়হান ১৯৩৩ সালে ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধে প্রখর ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় ভাষা প্রশ্নে এবং পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। অগ্রজ শহীদুল্লা কায়সারের সহযোগিতায় তিনি বাম রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন এবং ১৯৫৩–৫৪ সালের দিকে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। এই সময় কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ তাঁর রাজনৈতিক নাম ‘রায়হান’ দেন, যা তাঁর পারিবারিক নাম মো. জহির উল্লার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সকলের কাছে পরিচিত হয়।

জহির রায়হানের রাজনৈতিক সচেতনতা ছাত্র জীবনের প্রারম্ভ থেকেই লক্ষ্যযোগ্য। ১৯৪৫ সালে ‘ভিয়েতনাম দিবস’ মিছিলে অংশগ্রহণের সময় তিনি পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের মিছিলে তিনি বাঙালির অধিকার ও স্বাধীনতার জন্য তার শক্তিশালী কণ্ঠের মাধ্যমে শ্লোগান দেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে বাঙালিরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অবহেলিত ও নিগৃহীত হয়। এই পরিস্থিতি জহির রায়হানের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনা আরও গভীরভাবে জন্ম দেয়।

১৯৪৮ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু ঘোষণার পর বাঙালি যুবসমাজ প্রতিবাদে উত্তেজিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় জহির রায়হান ছিলেন একজন সাহসী কর্মী। তিনি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ছিলেন এবং একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিলের প্রথম দশজনের একজন ছিলেন। এ ঘটনায় তাকে পরে জেলে পাঠানো হয়। এই সময়ের অভিজ্ঞতা তার সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে।

জহির রায়হান ছিলেন একজন সাহিত্যিক এবং চলচ্চিত্রকার। তিনি বাংলা সাহিত্যে ও চলচ্চিত্র জগতে একাধারে পরিচিত। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তিনিই প্রথম সফল চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে বিবেচিত। তাঁর সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্রে রাজনৈতিক সচেতনতা, সমাজের অসাম্য এবং মানুষের সংগ্রামের চিত্রায়ণ লক্ষ্য করা যায়।

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই তিনি রচনা করেন উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’, যা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আবর্তিত। উপন্যাসের কাহিনী মাত্র তিন দিন দুই রাতের মধ্যে ঘটে। প্রথম দিনে কুয়াশাচ্ছন্ন সকালের মধ্য দিয়ে কাহিনী শুরু হয়, দ্বিতীয় দিনের রাত পর্যন্ত একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের প্রস্তুতি ও মিছিলের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় দিন পুলিশি হস্তক্ষেপ এবং মিছিলে সংঘর্ষের মাধ্যমে কাহিনী সমাপ্ত হয়। ভিক্টোরিয়া পার্কের নিখুঁত বর্ণনা, সিপাহী বিদ্রোহের স্মৃতি, এবং মুনিম চরিত্রের মাধ্যমে তিনি শৈল্পিকভাবে বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।

উপন্যাসে ছাত্রনেতা মুনিমের চরিত্র জহির রায়হানের নিজের ছাত্রজীবনের প্রতিফলন। পুলিশি হুমকি, জেলগেটের দৃশ্য, আত্মীয়দের উদ্বেগ—এই সব ঘটনার মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা পাঠকের কাছে স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। উপন্যাসে ব্যক্তিগত আবেগ, সতীর্থদের সহমর্মিতা, আন্দোলনের তীব্রতা এবং সাহসী পদক্ষেপগুলো সুন্দরভাবে উঠে এসেছে।

চলচ্চিত্র নির্মাণেও জহির রায়হান বাংলা সিনেমার ধারাকে নতুন মাত্রা প্রদান করেন। তাঁর চলচ্চিত্রে সমাজবিজ্ঞান, রাজনৈতিক সচেতনতা ও সাধারণ মানুষের সংগ্রামের বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে। চলচ্চিত্র ও সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে তিনি বাঙালি জাতির স্বাধীনচেতা চেতনা এবং ন্যায়বোধের ইতিহাস তুলে ধরেন।

জহির রায়হান ছিলেন কেবল একজন সাহসী ভাষা কর্মী নয়, বরং সমাজের অসংগঠিত ও অবহেলিত অংশের প্রতি দায়িত্ববোধপূর্ণ। তাঁর সাহিত্য ও চলচ্চিত্র কর্মের মধ্য দিয়ে তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আন্দোলন, সাহস ও ন্যায়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সাহিত্য-চলচ্চিত্রের মধ্যে তার অবদানের ধারা তাকে বাংলা সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

জহির রায়হানের জীবন ও কর্ম আমাদের শেখায়—একজন সত্যিকারের সাহিত্যিক ও নাগরিক কিভাবে সমাজের অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সচেতন থাকতে পারে এবং তার প্রতিফলন কিভাবে শিল্প ও সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে। ভাষা আন্দোলন ও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক তাকে আমাদের ইতিহাসে এক অনন্য স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window