জাহাঙ্গীর আলম শোভন: লেখক ও নীতি পরামর্শক

 জাহাঙ্গীর আলম শোভন একজন লেখক, সংগঠক, লেখক, প্রশিক্ষক, নীতি-পরামর্শক, সমাজকর্মী, পর্য টক ও  উদ্যোক্তা।   গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে, লোকসাহিত্য গবেষণা, তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স, ব্যবসায়িক সংগঠন, সামাজিক উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তাঁর কর্মজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার অভিজ্ঞতা।

জন্ম ও জন্মস্থান

পৈত্রিক নিবাস নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জে হলেও তিনি জন্মগ্রহণ করেন ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলায় মামাবাড়িতে। যদিও বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছেন।

শিক্ষা ও জ্ঞান

 বাণিজ্য বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও পরবর্তীতে সাংবাদিকতায় আগ্রহের কারণে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (PIB) থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নেতৃত্ব, সাংবাদিকতা, আর্থিক সাংবাদিকতা, সংকট ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং অন্যান্য বিষয়ে একাধিক প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। এসব প্রশিক্ষণ তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে।

পেশাগত জীবন

পেশাগত জীবনের শুরুতে তিনি স্বেচ্চাসেবী সংগছন ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। অভিজ্ঞতা অর্জ ন করেছেন বিপণন ও ব্যবস্থাপনা কাজে।  তথ্যপ্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ তাকে  এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্বে নিয়ে আসে।   যুক্তরাজ্যভিত্তিক দাতব্য সংস্থা আল কোরআর একাডেমী লন্ডনে তিনি -বিনামূল্যে কোরআন বিতরণ প্রকল্পে অংশ নিয়ে দেশে বিদেশে  অনুবাদসহ প্রায় ৩ লাখ পবিত্র কোরআন বিনামূল্যে বিতরণের কাজে অবদান রাখেন।  তিনি কাজ করেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, এনজিওতে, ট্রেড বডিতে এছাড়া  সামাজিক উন্নয়ন ও জনসম্পৃক্ততামূলক প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচালনাগত নেতৃত্বের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যবসা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবাখাতে তাঁর সম্পৃক্ততা আরও বৃদ্ধি পায়।

ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রি

তিনি বাংলাদেশ ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন (e-CAB)- এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় সংগঠনটি তার ইতিহাসের সবচেয়ে বেশী সাফল্য ও প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। সরকারী প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সহকর্মীদের সাথে মিলে ই-কমার্স সেক্টরে এই সময়ে গ্রাহকদের খোয়া যাওয়া প্রায় ৫শ কোটি টাকা ফেরত ফেতে তিনি ই-ক্যাব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করেন। সাবেক সচিব, সাবেক ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং সাবেক ডিজিটাল কমার্স সেল এর প্রধান এএইএচএম শফিকুজজ্জামানের সাথে মিলে দিন রাত কাজ করে গ্রাহকদের এই বিশাল অংকের অর্থ  বিভিন্ন মার্চে ন্ট থেকে ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হোন।

 এই সময়ে তিনি ই-কমার্স খাতের উন্নয়ন, সদস্যসেবা, সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়, নীতিগত আলোচনা এবং শিল্পখাতের প্রতিনিধিত্বমূলক কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল বাণিজ্য খাতে সংগঠন পরিচালনা, নীতি-আলোচনা এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় সাধনের অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ডব্লিওটিও সেল এর মহাপরিচালক হাফিজুর রহমান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্নসচিব ড.সাইফুদ্দিন আহমেদ ও উপসচিব মোহাম্মদ সাইদ আলীসহ অন্যান্যদের সাথে মিলে এই সময়ে এ সংক্রান্ত নীতি পলিসি উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশে ডিজিটাল বাণিজ্য ও ই-কমার্স খাতের নীতিগত বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন।

নীতি পরামর্শক

বিভিন্ন সরকারি পরামর্শ সভা, কর্মশালা এবং খসড়া প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত থেকে তিনি ডিজিটাল কমার্স অপারেশন গাইডলাইন ২০২১, টিসিবি পণ্যের অনলাইন বিক্রয় নীতি, ‘ডিজিটাল হাট’ গবাদিপশু বিক্রয় নির্দেশিকা, বৈদেশিক বাণিজ্য নীতি, স্মার্ট লজিস্টিকস নীতি এবং এসএমই নীতিমালাসহ বিভিন্ন উদ্যোগে মতামত ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করেন। পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার, শ্রম আইন, ট্রেড অর্গানাইজেশন আইন এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নীতিমালার সংশোধনী প্রস্তাবনা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন। এসব কার্যক্রম তাঁকে নীতি-সংলাপ ও খাতভিত্তিক অ্যাডভোকেসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে। তার পরামর্শ থেকে সরকারের বহু নীতি, নির্দেশিকা ও সিদ্ধান্ত ‍গৃহিত হয়েছে।  থেপ্রশিক্ষক হিসেবেও জাহাঙ্গীর আলম শোভনের পরিচিতি রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইসিটি বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়িক সংগঠন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে তিনি ই-কমার্স, সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল কনটেন্ট, নেতৃত্ব, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসায়িক উন্নয়ন বিষয়ে ১০০ টিরও বেশি প্রশিক্ষণ সেশন পরিচালনা করেছেন। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।

লেখালেখি বা লেখার জগৎ

লেখালেখি তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। তিনি বাংলা  ভাষায় ১৮টি বইয়ের লেখক। তাঁর বইগুলোর বিষয়বস্তু ব্যবসা, ই-কমার্স, আত্মউন্নয়ন, ভ্রমণ এবং সামাজিক বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত। এছাড়া তিনি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা, সাময়িকী এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লিখে থাকেন। ই-কমার্স ও ডিজিটাল অর্থনীতি বিষয়ক কলাম লেখার পাশাপাশি তিনি নীতি, সমাজ, ভ্রমণ ও উন্নয়ন বিষয়েও মতামত প্রকাশ করেন। তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগ ‘Shovonio.com’-এ বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক লেখালেখির ফলে তাঁর প্রকাশিত ব্লগ, নিবন্ধ ও ফিচারের সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি নোয়াখালী পিডিয়া (noakhalipedia.com) এর প্রতিষ্ঠাতা।  তার লেখা হাজারো প্রবন্ধ রয়েছে দেশি বিদেশী সংবাদ  ম্যাগাজিনে ও ব্লগে।

তার বইয়ের সংখ্যা ১৮টি। এখানে রয়েছে লোকসাহিত্য, ভ্রমণ, ই-কমার্স, বিপনন, আত্ম উন্নয়ন, উদ্যোগসহ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি লেখার নিয়ম সংক্রান্ত বইও।

তার সকল বই পেতে: https://www.rokomari.com/book/author/49409/jahangir-alam-shovon

ভ্রমণ- পর্যটন ও পর্যটন সচেতনতা

ভ্রমণ ও সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রমেও তাঁর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। ২০১৬ সালে তিনি তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ১,২৭৬ কিলোমিটার পদযাত্রা সম্পন্ন করেন। এই পদযাত্রা নিয়ে রয়েছে তার ২টি বই ‘‘দেখব বাংলাদেশ গড়বো বাংলাদেশ’’ এবং ‘‘পায়ে হেঁটে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ’’। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ও একটি বেসরকারী সংস্খা তাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করেছে।  এই যাত্রা সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচিত হয়।

একসময় তিনি কোথাও ভ্রমণে গেলে সেখানে গাছের ছারা রোপন করতেন বা গাচের বীজ রোপন করে আসতেন।

দেশের প্রায় সব জেলা ভ্রমণের পাশাপাশি তিনি ভারত, নেপাল, চীন, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন। ভ্রমণ তাঁর লেখালেখি ও সামাজিক পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে।  তিনি মূলত পর্যটন সচেতনতা নিয়ে কাজ করেন। দেশের বিভিন্ন জেলায় পর্যটন আড্ডা আয়োজন করে সংশ্লিষ্ঠদের নিয়ে এবিষয়ে কথা বলেন। তিনি প্রতি বছর অফ সিজনে ট্রলারে চড়ে অর্ধশতাধিক তরুন সমাজকর্মীকে নিয়ে বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমাটিন গমন করেন এবং এখানে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নেতৃত্ব দেন। এছাড়া সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন দূর্গম এলাকায় রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা ক্যাম্প ও মেডিক্যাল ক্যাম্প এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরীতেও কাজ করেছেন তিনি।

লোক সাহিত্য ও লোকজ ক্রীড়া

তিনি একসময় গ্রামে গঞ্জে সফর করে দেশের হারিয়ে যাওয়া লোকজ ক্রীড়া সংগ্রহ করেছেন। পরে এসব ক্রীড়ার উপর স্কুলের শিশুদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে সেসবের প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন। যাতে এসব ক্রীড়াগুলো হারিয়ে না যায়। তার লোকসাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন ২টি হলো: লোকজীবনের আয়না ও লোকজীবনের আনন্দ।

সামাজিক কর্মকান্ড

বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রেও তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় রয়েছেন। ফেনীতে শিক্ষাবৃত্তি কার্যক্রম,  পর্যটন ও পরিবেশ সচেতনতা এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। কোভিড-১৯ সময়কালে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে গঠিত কেন্দ্রীয় লকডাউন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেন। একই সময়ে মানবিক সহায়তামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমেও অংশ নেন। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি এবং সামাজিক কর্মীদের নেটওয়ার্কভিত্তিক উদ্যোগেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।

পুরষ্কার ও স্বীকৃতি

তাঁর কর্ম ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে তিনি একাধিক পুরস্কার লাভ করেন। এর মধ্যে রয়েছে স্মার্ট বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড ২০২৩, এসএমই ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২৩, ডিজিটাল বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড ২০২১, ই-কমার্স কনটেন্ট রাইটার অ্যাওয়ার্ড এবং ই-কমার্স ব্লগার অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এবং বিভিন্ন টেলিভিশন ও রেডিও অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন।

মাছরাঙা টেলিভিশনের রাঙা সকাল অনুষ্ঠানে তার জীবন ও কর্ম নিয়ে ১ ঘন্টার একটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রকাশ করে। দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ২০১৭ সালে ৪০ জন প্রশংসিত বাংলাদেশীকে নিয়ে একটি বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে তাতে স্থান পায় তার নাম। জাপানী প্রতিষ্ঠা JETRO তাদের ওয়েবসাইটে তার একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে জাপানী ভাষায়। শ্রীলংকার প্রত্রিকা শিলংঢুডে তাকে নিয়ে স্টোরি করে। বাংলাদেশের কয়েকটি রেডিও স্টেশন তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতা প্রকাশ করে। এরমধ্যে রয়েছে রেডিও ফূর্তি, রেডিও একাত্তর ও রেডিও ধ্বনি।

সামগ্রিকভাবে জাহাঙ্গীর আলম শোভনের কর্মজীবনকে একটি বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় হিসেবে দেখা যায়। সংগঠন পরিচালনা, নীতি-আলোচনা, প্রশিক্ষণ, লেখালেখি, সামাজিক উদ্যোগ এবং ডিজিটাল অর্থনীতি বিষয়ক কাজের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর পেশাগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ড মূলত জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নেটওয়ার্ক গঠনের ওপর কেন্দ্রীভূত।

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window