ফেনীর রামগঞ্জ উপজেলার শোল্লা গ্রামে ১ জানুয়ারি ১৯২৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন ড. খলিলুর রহমান। পিতা আলহাজ্ব আবিদ মিয়া এবং মাতা ফজরের নেছার ঘরে জন্ম নেওয়া এই প্রতিভাবান শিক্ষাবিদ ছিলেন জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এক অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন।
তিনি সি পি জি হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকে ডিস্টিঙ্কশনসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৪২ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আই’এ পাশ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৬ সালে অর্থনীতিতে বিএ অনার্স ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষাজীবন শুরু হয় কুমিল্লা ফয়জুনন্নেসা কলেজ থেকে, যেখানে তিনি অধ্যাপনার মাধ্যমে তার কর্মজীবনের প্রথম পদক্ষেপ নেন। পরবর্তী সময়ে তিনি রাজশাহী কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ এবং চট্টগ্রাম কমার্স কলেজেও অধ্যাপনা করেন।
১৯৬২ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড মেকানিকাল (এ, এন্ড এম) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষি অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণাপত্রের মান এতই উন্নত ছিল যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে একটি বিশেষ সনদ প্রদান করে উল্লেখ করেন: “ইন দি হিস্ট্রি অব দি ইউনিভার্সিটি উই হ্যাব নেভার ফাউন্ড স্যাচ এ ফাইন থিসিস এভার বিফোর।” এছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে সম্মানজনক নাগরিকত্ব প্রদান করে, যা বিদেশী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরল সম্মান।
দেশে ফিরে তিনি কিছু সময় সিলেট এমসি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে পাকিস্তান প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ কলেজ (লাহোর) এর পরিচালক পদে নিযুক্ত হন এবং এই পদে প্রথম বাঙালি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি কিছুদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওএসডি থাকেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হন। শিক্ষা বোর্ডে কিছু দুর্নীতিমূলক কার্যাবলী উদঘাটনের ফলে রাজনৈতিক চাপের কারণে তাকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে স্থানান্তর করা হয়। এরপর তিনি বাংলাদেশ প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ কলেজে ভাইস প্রিন্সিপাল এবং ১৯৭৮ সালে জনশিক্ষা পরিচালক (ডিপিআই) হিসেবে নিযুক্ত হন। জীবনশেষ পর্যন্ত তিনি এ পদেই বহাল ছিলেন।
ড. খলিলুর রহমান ছিলেন আজীবন কৃতি ছাত্র ও অনন্য প্রতিভার অধিকারী। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি বিদেশী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য একাধিকবার পুরস্কৃত হন। ১৯৬১ সালে তিনি “বেস্ট ফরেন স্টুডেন্ট আওয়ার্ড” লাভ করেন। এছাড়া, আমেরিকায় অধ্যয়নরত শীর্ষস্থানীয় স্থানীয় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয় এবং কৃষি অর্থনীতিতে তার অসাধারণ পান্ডিত্যের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি তাকে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের নিকট প্রস্তাব পাঠান।
সমাজসেবায়ও তিনি ছিলেন উদার ও নিবেদিতপ্রাণ। লাহোরে অবস্থানকালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে সাহায্য করেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আগত বহু বেকার যুবককে চাকরির সংস্থানে সহায়তা প্রদান, পাকিস্তান অর্থনীতি সমিতির চট্টগ্রাম শাখার সম্পাদক, যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তান ছাত্র সমিতির সভাপতি, জাতিসংঘ ক্লাবের সভাপতি এবং কামালপুর হাইস্কুলের অবৈতনিক প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি সমাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন।
তাঁর লেখাগুলোর মধ্যে Economics For Layman উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা, প্রশাসন ও সমাজসেবার প্রতি তার অঙ্গীকার তাঁকে সময়ের সেরা বাঙালি শিক্ষাবিদ ও প্রশাসক হিসেবে পরিচিত করে। ড. খলিলুর রহমান ১৯৭৮ সালে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।
ড. খলিলুর রহমানের জীবন আমাদের শেখায় যে, জ্ঞান, নিষ্ঠা এবং সমাজসেবার সমন্বয়ই একজন মানুষকে সত্যিকারের প্রেরণার উৎসে পরিণত করতে পারে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১৩, ২০২৫