বাংলা সাহিত্য ও গবেষণার জগতে ড. খালেদ মাসুদে রসুল এক উজ্জ্বল নাম। তিনি যেমন একজন দক্ষ গবেষক, তেমনি সাহিত্যিক, সম্পাদক, অনুবাদক এবং শিক্ষক হিসেবেও সমান খ্যাতিমান। নোয়াখালীর লোকজ সংস্কৃতি, প্রবাদ-প্রবচন, খেলাধুলা ও পল্লীজীবনের রঙিন চিত্র তাঁর লেখায় অনবদ্যভাবে ফুটে উঠেছে।
ড. খালেদ মাসুদে রসুল ১৯৪৩ সালে নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম হাজী আমিনুর রসুল একজন সুপরিচিত আইনজীবী ছিলেন, আর মাতা বদরুন্নেসা আবদুল্লাহ ছিলেন এক আদর্শ গৃহিণী। সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনা পরিবারের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে পাঠাভ্যাস ও লেখালেখির আগ্রহ তৈরি হয়।
তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে বাংলা সাহিত্যে এম.এ. ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যচর্চার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন। এরপর তিনি গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৮০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি “নোয়াখালীর লোক সাহিত্যে লোক জীবনের পরিচয়” বিষয়ে এম.ফিল ডিগ্রি অর্জন করেন—যা নোয়াখালীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এক নতুন আলোয় উদ্ভাসিত করে। পরে ১৯৮৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংগঠনের সঙ্গে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তিনি ‘বাংলা সমিতি’র সহ-সাধারণ সম্পাদক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিফেক্টর জেনারেল (সাধারণ সম্পাদক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নোয়াখালী সাহিত্য মজলিসের সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন। এসব সংগঠনের মাধ্যমে তিনি তরুণ লেখক ও গবেষকদের উৎসাহিত করেছেন এবং নোয়াখালীর আঞ্চলিক সাহিত্যকে মূলধারার আলোচনায় নিয়ে এসেছেন।
এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য ও এসিয়াটিক সোসাইটিরও সদস্য ছিলেন—যা প্রমাণ করে যে তাঁর সাহিত্যচর্চা ও গবেষণা কেবল আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জাতীয় পরিসরেও সমানভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে।
ড. খালেদ মাসুদে রসুল ছিলেন এক বহুমাত্রিক লেখক। তাঁর লেখার পরিধি যেমন বিস্তৃত, তেমনি বৈচিত্র্যপূর্ণ। নিচে তাঁর প্রধান সাহিত্যকর্মগুলো শ্রেণিবদ্ধভাবে তুলে ধরা হলো—
তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র ছিল বাংলা লোকসাহিত্য, সুফীতত্ত্ব, ইতিহাস, সাহিত্য ও সমাজসংস্কৃতি। উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থসমূহ—
‘শেখ আব্দুর রহিম’, ‘আব্দুল বারি কবিরত্ব’, ‘অগ্নি-পুরুষ সিরাজী’, ‘নোয়াখালীর লোক সাহিত্যে লোক জীবনের পরিচয়’, ‘বাংলা মহাকাব্যে কায়কোবাদ’, ‘সুফীতত্ত্ব’, ‘ভার্টির বাঘ শমশের গাজী’, ‘লোকনৃত্য’, ‘পল্লী মেলা’, ‘লৌকিক খেলাধুলা’, ‘এয়াকুব আলী চৌধুরী’, ‘খান বাহাদুর হামিদুল্যা খাঁন’, ‘চট্টগ্রাম জামে মসজিদের ইতিবৃত্ত’, ‘নোয়াখালী পৌরসভার ইতিবৃত্ত’ এবং ‘বৃহত্তর নোয়াখালীর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস’।
এই গ্রন্থগুলো শুধু গবেষণামূলক নয়; এগুলোর প্রতিটিই বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি, সমাজ ও ইতিহাসের দলিল।
সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাঁর কাজও উল্লেখযোগ্য। তিনি সম্পাদনা করেছেন—
‘সোনার তরী’, ‘শ্রীকান্ড প্রথম পর্ব’ ও ‘কারবালা কাব্য’।
এই গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট পুনর্মুদ্রণ ও বিশ্লেষণের সুযোগ করে দেন।
তিনি ইতিহাস ও জীবনচরিতমূলক গ্রন্থ অনুবাদের ক্ষেত্রেও পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর অনূদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
‘টিপু সুলতান’, ‘তারিখে হামিদ’, ‘নসবন মায়ে মুহান্নক’।
এসব অনুবাদ বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য ইসলামি ইতিহাস ও দক্ষিণ এশীয় রাজনীতি বোঝার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
গল্প ও উপন্যাস রচনায়ও তিনি সমান দক্ষ ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ—
‘গল্পে তেরশ সাতাত্তর’, ‘গল্পে মীর কাশেম’, ‘খালেদ মাসুদে রসুলের শ্রেষ্ঠ গল্প’।
কাব্যগ্রন্থ: ‘কুজন’।
উপন্যাস: ‘প্রতিদান’, ‘অবশেষে’, ‘বিধবার মেয়ে’, ‘নীড় তাড়া ঝড়’, ‘পথের শেষে’, ‘তপির’, ‘পরিণাম’।
নাটক: ‘সমাধান’, ‘মেঘে ঢাকা চাঁদ’।
রসরচনা: ‘হাদির কথা’।
বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্য নিয়ে তাঁর গভীর গবেষণার পরিচয় পাওয়া যায় নিম্নোক্ত গ্রন্থে—
‘চৌধুরীর লড়াই’, ‘নোয়াখালীর ধাঁ ধাঁ’, ‘নোয়াখালীর খনার বচন’, ‘নোয়াখালীর প্রবাদ’।
এছাড়াও কলমী পুঁথি বিষয়ক তাঁর গবেষণাগ্রন্থ—
‘রূপচন্দ্র কুমার’ এবং ‘সাহাপরিরূপ জালাল’—বাংলা পুঁথি সাহিত্যচর্চায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
ড. খালেদ মাসুদে রসুলের সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীরভাবে মানবিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, লোকসাহিত্যই একটি জাতির অন্তর্গত আত্মা, যেখানে সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম, সংগ্রাম ও আশা লুকিয়ে থাকে। তাঁর লেখায় তাই আমরা পাই নোয়াখালীর মাটি, মানুষের ভাষা, উৎসব, লোকখেলা ও কাহিনির মূর্ত প্রকাশ।
তিনি ছিলেন এমন একজন লেখক, যিনি বইয়ের ভেতর দিয়ে মানুষের মুখ, মাঠ, নদী আর সংস্কৃতির ধ্বনি শোনাতে জানতেন। তাঁর গবেষণা শুধু একাডেমিক তথ্যভিত্তিক নয়, বরং অনুভবনির্ভর—যা পাঠককে ইতিহাসের পাশাপাশি সংস্কৃতির হৃদয়েও পৌঁছে দেয়।
বাংলা সাহিত্য ও গবেষণার ইতিহাসে ড. খালেদ মাসুদে রসুলের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে। নোয়াখালীর লোকজ সংস্কৃতিকে যেভাবে তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নথিবদ্ধ করেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর রচনাসমগ্র আজও গবেষক ও পাঠকদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ২১, ২০২৫