বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার ইতিহাসে তোফায়েল আহমদ এক অগ্রগণ্য নাম। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। প্রাচীন লোকশিল্পের ওপর তাঁর গবেষণা শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও প্রশংসিত হয়েছে।

তোফায়েল আহমদের জন্ম ১৯১৯ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার বড়লিয়া গ্রামে। শৈশব থেকেই তিনি মেধাবী ও জ্ঞানপিপাসু ছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে অর্থনীতিতে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। অর্থনীতির ছাত্র হয়েও তিনি সংস্কৃতি ও শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর কর্মজীবনকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করে।

১৯৫০ সালে তিনি টাঙ্গাইলের করটিয়া সাদাত কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর (১৯৫০–১৯৬৬) তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দক্ষ নেতৃত্ব ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় সাদাত কলেজ সে সময় উল্লেখযোগ্যভাবে সমৃদ্ধ হয় এবং শিক্ষার্থীদের কাছে অন্যতম একটি মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে।

অধ্যক্ষ হিসেবে দীর্ঘ দায়িত্ব পালন শেষে তিনি বাংলাদেশ পরিষদের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেখান থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তবে তাঁর কাজ কেবল প্রশাসনিক পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি সংস্কৃতি ও লোকশিল্পের ক্ষেত্রেও অবদান রেখে গেছেন অমর কীর্তি হিসেবে।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) বাংলাদেশের লোকশিল্প জরিপের যে প্রকল্প চালু করে, সেখানে তিনি এশিয়ার বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে এ প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

পরবর্তীতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে গঠিত সোনারগাঁও লোক ও চারু কলা ফাউন্ডেশনের প্রকল্প প্রধান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দিকনির্দেশনায় ফাউন্ডেশনটি বাংলাদেশি প্রাচীন লোকশিল্পের সংরক্ষণ ও প্রদর্শনীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

তোফায়েল আহমদ সাহেবের গবেষণা ও লেখালেখি বিশেষভাবে প্রশংসিত। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ আমাদের প্রাচীন শিল্প” বাংলাদেশের লোকশিল্পের ঐতিহ্য, বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধিকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে। এ বই প্রমাণ করে, প্রাচীন শিল্পকলার ঐতিহ্যে বাংলাদেশ কত সমৃদ্ধশালী।

এছাড়া তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ নোয়াখালীর গোঁসা গান”। এতে তিনি নোয়াখালীর লোকসংস্কৃতির এক বিশেষ ধারাকে সংরক্ষণ করেছেন, যা আজও গবেষক ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে মূল্যবান।

তোফায়েল আহমদ ছিলেন এক অসাধারণ শিক্ষক, সাংস্কৃতিক গবেষক ও প্রশাসক। শিক্ষা থেকে শুরু করে লোকশিল্প সংরক্ষণ—প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছে। তাঁর মতো ব্যক্তিত্বের কারণে বাংলাদেশের প্রাচীন শিল্প, লোকসংস্কৃতি ও শিক্ষার ভাণ্ডার আজও সমৃদ্ধ হয়ে আছে।

 

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window