বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজে এমন কিছু নাম আছে যারা শুধু লেখার মাধ্যমে নয়, গবেষণা, ইতিহাসচর্চা ও সমাজ-অর্থনীতি নিয়ে কাজের মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক অঙ্গনে গভীর প্রভাব রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন তোফায়েল আহমেদ—একজন প্রাবন্ধিক, গবেষক, লেখক ও সমাজ-বিশ্লেষক, যিনি সাহিত্য, ইতিহাস ও সাংবাদিকতার বিভিন্ন ধারায় সমানভাবে অবদান রেখেছেন।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৩৮ সালে নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জনাব আতিকউল্যা এবং মাতা আঞ্জুমান বেগম ছিলেন স্নেহশীল ও শিক্ষিত। পরিবারের শিক্ষাব্যবস্থা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁকে ছোটবেলা থেকেই বই ও লেখালেখির প্রতি অনুরাগী করে তোলে।
তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৮ সালে অর্থনীতিতে বি.এ. (অনার্স) ও ১৯৫৯ সালে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের প্রাথমিক ভিত্তি এখান থেকেই তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে তাঁর গবেষণা ও প্রবন্ধে প্রতিফলিত হয়।
১৯৫৯ সালে চাকুরী জীবনের সূচনা করেন পাট অনুসন্ধান কমিশনে সহকারী গবেষক হিসেবে। এখান থেকেই তাঁর প্রশাসনিক ও গবেষণামূলক দক্ষতা বিকশিত হয়। পরবর্তীতে তিনি বানিজ্য মন্ত্রনালয়ের ট্যারিফ কমিশনের সচিব হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
চাকুরীর পাশাপাশি সাহিত্য ও গবেষণার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ছিল অবিচল। তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন কর্মজীবী ব্যক্তিও সাহিত্য ও গবেষণায় গভীর অবদান রাখতে পারেন।
তোফায়েল আহমেদের সাহিত্যকর্ম ও গবেষণার পরিধি বিস্তৃত—বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সমাজনীতি, লোকসাহিত্য, সাংবাদিকতা ও বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজের উপর তাঁর লেখনী গভীর প্রভাব ফেলেছে।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো:
-
‘History of Kushtia’ – কুষ্টিয়ার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে সমৃদ্ধ গবেষণা।
-
‘Lalon Shah and Lyrics of the Padma’ – বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক সংগীত ও লোকসাহিত্যের আলোকে লালন শাহের কাব্যচর্চা বিশ্লেষণ।
-
‘Social-Political Economy of Advertising and Pamphlet Circulation’ – সমাজ ও অর্থনীতির দৃষ্টিতে বিজ্ঞাপন ও প্রচারপত্রের বিশ্লেষণ।
-
‘Sociology of Kushtia: The Journalist and Bangladesh’ – কুষ্টিয়ার সমাজবিজ্ঞান ও সাংবাদিকতার সম্পর্ক।
-
‘Bangladesh Antiquities and Museums: Mujib & Bangladesh Revolution’ – বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সংগ্রহ, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট।
-
‘নোয়াখালী বিষয়াবলী’, ‘পাঁচগাঁও অধ্যায়ন’, ‘পাঁচগাঁও নোয়াখালী পদাবলী’ – নোয়াখালীর লোক, সংস্কৃতি ও কাব্যচর্চা নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ।
-
‘চাকরিজীবী অথচ লেখক’, ‘বাংলাদেশের সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা’ – কর্মজীবী ও সাংবাদিকতার সংমিশ্রণ।
-
‘বাংলাদেশের আত্মার সন্ধানে: লোক সাহিত্যাচার্য মনসুরউদ্দিন’, ‘ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশে’ – বাংলাদেশের সমাজ ও আধ্যাত্মিকতার প্রভাব।
-
‘নোয়াখালী লেখক ও বুদ্ধিজীবী পরিচিতি’, ‘নোয়াখালী প্রতিভা’, ‘পাঁচগাঁও প্রতিভা’ – নোয়াখালীর সাহিত্য ও বুদ্ধিজীবী সমাজের চিত্র।
-
‘বিশিষ্ট বাঙ্গালি’, ‘স্বর্ণ বর্ষের কনক’, ‘প্রদীপ সিদ্দিকুর রহমান আমার বন্ধু’, ‘বরন্যে বাংগালী’, ‘অতীষ দীপংকর’ – বাংলাদেশ ও বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা দিক।
এছাড়া তিনি ১২০টিরও বেশি পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ, প্রবন্ধমূলক কবিতা, গল্প ও গবেষণা প্রকাশ করেছেন।
তোফায়েল আহমেদের লেখা সমকালীন সমাজ ও ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করার এক অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লেখা। তাঁর লেখায় দেখা যায়—
-
ইতিহাস ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ
-
সমাজ ও অর্থনীতির বিশ্লেষণ
-
সাংবাদিকতা ও তথ্যচর্চার গুরুত্ব
-
নোয়াখালীর লোক সংস্কৃতি ও সাহিত্যচর্চার গভীর পর্যবেক্ষণ
তিনি প্রমাণ করেছেন যে সাহিত্য ও গবেষণা কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং সমাজ ও ইতিহাসের দায়িত্বও। তাঁর গ্রন্থগুলি আজও গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য মূল্যবান।
তোফায়েল আহমেদ নোয়াখালীসহ বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
তাঁর গ্রন্থ ও প্রবন্ধগুলো শুধু তথ্যসংগ্রহ নয়, বরং চিন্তার আহ্বান ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণেও সমৃদ্ধ।
তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের ইতিহাস, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর রচনাবলী ভবিষ্যতের গবেষক ও সাহিত্যিকদের জন্য দিকনির্দেশক।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক অঙ্গনে তাঁর অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ২১, ২০২৫