ঔপনিবেশিক শাসনের শেষলগ্নে ভারতবর্ষের শিক্ষা-সংস্কৃতির ভাঙাগড়ার এক অস্থির সময়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে দেশের মানুষ জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ে যখন ব্যস্ত, তখন ব্রিটিশ সরকার বাঙালি হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করে। ফলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষায় এগিয়ে থাকলেও মুসলমানদের অবস্থা ছিল অত্যন্ত পশ্চাৎপদ; বিশেষ করে মেয়েদের জন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রিয় ব্যক্তিত্ব মরহুম হাজী সৈয়দ একস্ মিয়া ১৯৩৭ সালে দুধমুখা বাজার থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে উলাল মিয়ার বাড়ির সামনের উঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে টিনের ঘরে দুধমুখা প্রাইমারি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার সময় প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন মরহুম চাঁন মিয়া পণ্ডিত।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত স্কুলটির দায়িত্ব পালন করেন মরহুম নাদরেজমান (নাদু মিয়া)। তাঁর নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও নিরলস পরিশ্রমে বিদ্যালয়টি দ্রুত অগ্রগতি লাভ করে। বৃত্তি পরীক্ষায় সফলতা বাড়াতে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে ছাত্রদের পড়াতেন। ১৯৪৬ সালে স্কুলটি এম.ই. বিভাগে উন্নীত হয় এবং পরে জুনিয়র স্কুলে রূপান্তরিত হয়।
১৯৪৭ সালে এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মরহুম লাল মিয়া পণ্ডিত স্থান সংকুলান, যোগাযোগ সুবিধা ও বাজারের গুরুত্ব বিবেচনায় বিদ্যালয়টি বর্তমান দুধমুখা বাজারের উত্তর মসজিদ সংলগ্ন স্থানে স্থানান্তর করেন। সেখানে পূর্ব-পশ্চিমমুখী প্রাইমারি এবং উত্তর-দক্ষিণমুখী জুনিয়র হাইস্কুলের জন্য দুটি লম্বা টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়—যেখানে বর্তমানে দুধমুখা ঈদগাহ ময়দান অবস্থিত। এ সময় প্রধান শিক্ষক ছিলেন মরহুম অলি উল্যাহ মিয়া, যিনি ইংরেজি শিক্ষায় বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ছাত্ররা তাঁকে ‘ইংরেজি ডিকশনারি’ বলে ডাকত।
এই সময়ে সাংস্কৃতিক চর্চা ও বাংলা শিক্ষার উন্নয়নে অসাধারণ অবদান রাখেন স্বর্গীয় কামিনী কান্ত ভৌমিক (ভূঁইয়া স্যার)। এছাড়াও বিদ্যালয়ের উন্নয়নে অবদান রাখেন প্রধান শিক্ষক জনাব নূরুল হুদা চৌধুরী (মন্টু মিয়া), জনাব গণি মিয়া, জনাব আজিজুল হক বি.এড, জনাব সেকান্দর মিয়া (সহকারী প্রধান শিক্ষক) প্রমুখ।
১৯৭২ সালের শুরুতে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিদ্বান ব্যক্তিত্ব জনাব মজিবুল হক জনাব মোস্তাফিজুর রহমান এম.এ-কে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেন। তাঁর সময়েও বিদ্যালয়ের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়।
১৯৬৬ সালে মরহুম মজিবুল হক (মঞ্জু মিয়া)-এর উদ্যোগে জুনিয়র হাইস্কুলকে পূর্ণাঙ্গ হাইস্কুলে রূপান্তরের লক্ষ্যে দুধমুখা বাজারের দক্ষিণে বর্তমান বিদ্যালয় স্থানের নির্বাচন করা হয়। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৬৮ সালে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত হয় এবং নবম শ্রেণির কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭০ সালে প্রথম এসএসসি পরীক্ষার যাত্রা শুরু করে। এ বিদ্যালয়ের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী পরবর্তীতে এখানেই শিক্ষকতা করেন—যাদের মধ্যে জনাব তাজুল ইসলাম (বি.এড) ও বাবু সন্তোষ কুমার শীল (বি.এসসি) উল্লেখযোগ্য।
দুধমুখা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করে অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশে উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন—ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কবি-সাহিত্যিক, ব্যাংকার, সচিবালয়ের কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তারা কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমান ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাণের দাবি—বিদ্যালয়ে একটি আবাসিক ছাত্রাবাস ও বিজ্ঞান ভবন নির্মাণ। ছোট্ট প্রাইমারি স্কুল থেকে বহুতল ভবনের আধুনিক উচ্চ বিদ্যালয় হয়ে উঠেছে দুধমুখা স্কুল। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একে কলেজে উন্নীত করা সম্ভব। আমরা প্রত্যাশা করি—দুধমুখা উচ্চ বিদ্যালয় একদিন অবশ্যই মহাবিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হবে।
প্রিয় পাঠক এই বিষয়ে আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন।
Last modified: ডিসেম্বর ১, ২০২৫