বাংলার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কর্ম ও দানের মাধ্যমে সমাজে এক স্থায়ী দৃষ্টান্ত গড়ে উঠেছে। নবাব বদরুদ্দীন হায়দার চৌধুরী ছিলেন তেমনই এক ব্যক্তিত্ব—যিনি শিক্ষা, সমাজসেবা এবং মানবকল্যাণের প্রতিটি ক্ষেত্রে রেখে গেছেন অমলিন ছাপ।

নবাব বদরুদ্দীন হায়দার চৌধুরীর পৈতৃক নিবাস ছিল নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে। তাঁর পরিবার ছিল স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সমাজসেবার ঐতিহ্যে গড়া এক বিশিষ্ট চৌধুরী বংশ। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, উদারমনস্ক ও দূরদর্শী। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর তিনি কলকাতায় স্থায়ী হন এবং দ্রুতই শহরের অভিজাত সমাজে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।

তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয় প্রশাসনিক দায়িত্বে। তিনি কলকাতা কোর্টের অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাৎ, তিনি কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ না করেই জনসেবায় নিজেকে নিবেদন করেন। এই নিঃস্বার্থ সেবাই তাঁকে সমাজে একজন শ্রদ্ধেয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।

দেশ ও সমাজকল্যাণে বদরুদ্দীন হায়দার চৌধুরীর অবদান ছিল সত্যিই অনন্য। তিনি ছিলেন নোয়াখালী মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনের (কলকাতা) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটি কলকাতায় বসবাসরত নোয়াখালীবাসীদের জন্য একতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি শহরের অবকাঠামো ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তাঁর সমাজসেবার ক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত। বিশেষত, শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। অনেক গরিব কিন্তু মেধাবী ছাত্রের জন্য তিনি নিজের কলকাতাস্থ বাসভবনে বিনা খরচে থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। এই ব্যবস্থা শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়—ছিল এক ধরনের নৈতিক ও মানসিক উৎসাহ, যা বহু ছাত্রের জীবনগঠনে ভূমিকা রাখে। তাঁর এই মানবিক উদ্যোগ সেই সময়ের সমাজে এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি বদরুদ্দীন হায়দার চৌধুরী ছিলেন এক দূরদর্শী চিন্তাবিদও। তিনি বুঝতেন, বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর সঙ্গে রাজধানী কলকাতার সুসংযোগ স্থাপন ছাড়া সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি বাংলার বিভিন্ন অংশের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে রেললাইন নির্মাণে সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেন। তাঁর উদ্যোগ ও আর্থিক সহায়তা এই অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা পরবর্তী প্রজন্মের বাণিজ্য, শিক্ষা ও প্রশাসনিক সুবিধা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।

নোয়াখালী মুসলিম এসোসিয়েশন পরিচালনায় তাঁর অবদান দীর্ঘ ১১ বছরব্যাপী—১৯১২ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন এই সংগঠনের সভাপতি। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটি মুসলিম সমাজে শিক্ষা ও ঐক্যের এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি করে। এই সময়েই তিনি নোয়াখালীর মানুষের কল্যাণে অসংখ্য দান-অনুদান প্রদান করেন এবং সমাজে সংস্কারমূলক চিন্তার প্রসার ঘটান।

নবাব বদরুদ্দীন হায়দার চৌধুরী শুধু একজন সমাজসেবক বা দানবীরই ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক চিন্তাশীল অভিভাবক, যিনি মানবকল্যাণকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর জীবনদর্শন ছিল সহজ কিন্তু গভীর—মানুষের উপকারই জীবনের প্রকৃত মূল্য।

১৯২৩ সালে, দীর্ঘ এক কর্মমুখর জীবনের অবসান ঘটে এই মহান ব্যক্তির। তিনি কলকাতায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে শুধু নোয়াখালী নয়, সমগ্র বঙ্গ সমাজ এক মহান মানবতাবাদী ব্যক্তিত্বকে হারায়।

ব্যক্তিজীবনে নবাব বদরুদ্দীন হায়দার চৌধুরী ছিলেন এক সুশিক্ষিত ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবারের কর্তা। তাঁর জামাতা ছিলেন সাবেক পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি জনাব আমীন আহমদ, যিনি নিজেও ছিলেন সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার জন্য খ্যাত। এ থেকে বোঝা যায়, বদরুদ্দীন হায়দার চৌধুরীর পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল জ্ঞান, ন্যায় ও মানবতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।

আজও নবাব বদরুদ্দীন হায়দার চৌধুরীর নাম শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হয় নোয়াখালী ও কলকাতার পুরোনো সমাজে। তাঁর দান, সহমর্মিতা, এবং নেতৃত্বের আদর্শ সময়ের সীমানা পেরিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য এক স্থায়ী অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে।

তিনি ছিলেন সেই মানুষ, যিনি ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজকল্যাণকে জীবনের ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন—বাংলার এই মহৎ সন্তান নবাব বদরুদ্দীন হায়দার চৌধুরী আজও মানবতার আলো হয়ে জ্বলে আছেন ইতিহাসের পাতায়।

সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান

লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window