বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে নুরুন্নবী চৌধুরীর নাম একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি শুধু একজন দক্ষ খেলোয়াড়ই ছিলেন না, ছিলেন সেই সময়ের এক প্রতীক—যিনি প্রমাণ করেছিলেন, এক বাঙালিও আন্তর্জাতিক ফুটবলে নেতৃত্ব দিতে পারে। পাকিস্তান জাতীয় দলের প্রথম বাঙালি অধিনায়ক হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
নুরুন্নবী চৌধুরী ১৯৩৪ সালে তৎকালীন নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার আজিজ ফজিলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব কেটেছে সবুজে ঘেরা এক গ্রামীণ পরিবেশে, যেখানে খেলার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। ছোটবেলা থেকেই তিনি ফুটবলের প্রতি অনুরাগী ছিলেন এবং স্কুলজীবনেই অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেন।
কমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি কলেজ ফুটবল দলে খেলতেন এবং পাশাপাশি কমিল্লা ফুটবল লীগে পাক ইউনাইটেড ক্লাব–এর হয়ে মাঠে নামতেন। তাঁর খেলার ধরন ছিল দৃঢ়, দ্রুত এবং সংগঠিত—যা পরবর্তীতে তাঁকে জাতীয় দলের দরজায় পৌঁছে দেয়।
১৯৫২ সালে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড মইদীন কুট্টির পরামর্শে তিনি Pakistan Air Force FC–এর হয়ে ইন্টার সার্ভিস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তাঁর ফুটবল প্রতিভা গোটা পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকায় আসেন এবং Dhaka Wanderers Club–এর হয়ে খেলতে শুরু করেন। এই সময়েই তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৫৪, ১৯৫৫ ও ১৯৫৬—এই তিনটি বছর তিনি ধারাবাহিকভাবে ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশন লিগের শিরোপা জয় করেন। পাশাপাশি ১৯৫৫ সালের পাকিস্তান ডে ফুটবল টুর্নামেন্ট ও ১৯৫৬ সালের ইন্ডিপেনডেন্স কাপও জয় করেন।
১৯৫৮ সালে তিনি কলকাতার বিখ্যাত IFA Shield–এ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে অংশ নেন এবং সেই বছরই ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আগা খান গোল্ড কাপ–এর উদ্বোধনী আসরে PWD স্পোর্টস ক্লাবের অধিনায়ক হিসেবে খেলেন।
এই সময়েই তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীর চাকরি ছাড়েন এবং ১৯৫৯ সালে East Pakistan Police–এ যোগ দেন। সেখানে তিনি ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ফুটবল খেলেন এবং অবসর নেন।
নুরুন্নবী চৌধুরী ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ ছিল সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে, যা ২–২ গোলে ড্র হয়। সেই বছরই তিনি ম্যানিলা এশিয়ান গেমস–এ পাকিস্তানের হয়ে অংশগ্রহণ করেন।
এরপর তিনি ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালের এশিয়ান কোয়াড্র্যাঙ্গুলার ফুটবল টুর্নামেন্ট–এ খেলেন। ১৯৫৫ সালের আসরটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকায়, যা ছিল তাঁর জীবনের একটি গর্বের অধ্যায়। ১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তান দলের সঙ্গে সিঙ্গাপুর, চীন ও সিলনের (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) সফরে অংশ নেন।
১৯৫৮ সালে টোকিও এশিয়ান গেমস–এ তিনি পাকিস্তান দলের অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন — তিনিই প্রথম বাঙালি যিনি পাকিস্তানের জাতীয় ফুটবল দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই টুর্নামেন্টে তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তান দক্ষিণ ভিয়েতনামের সঙ্গে ১–১ গোলে ড্র করে এবং রিপাবলিক অব চায়নার বিপক্ষে ১–৩ গোলে পরাজিত হয়।
তাঁর নেতৃত্বে ছয়জন বাঙালি ফুটবলার একসঙ্গে পাকিস্তান দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন, যা পূর্ব পাকিস্তানের ফুটবলে এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
দেশের মাটিতেও তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক। ১৯৫৭ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান হোয়াইটস দলের হয়ে ন্যাশনাল ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ–এ অংশ নেন। তাঁর দল ফাইনালে পাঞ্জাবের কাছে পরাজিত হলেও তিনি টুর্নামেন্টজুড়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখান।
১৯৫৯ সালে হায়দরাবাদে অনুষ্ঠিত আসরে তাঁর দল রানার্সআপ হয়, কিন্তু ১৯৬০ সালে করাচিতে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে ইস্ট পাকিস্তান প্রথমবারের মতো জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়। এই জয় পূর্ব পাকিস্তানের ফুটবলে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে নবী চৌধুরী ফুটবল প্রশাসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) জাতীয় দলের সিলেকশন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেই বছরই প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখেন।
তিনি শেখ সাহেব আলী, মঞ্জুর হাসান মিন্টু ও রণজিৎ দাসের সঙ্গে মিলে ১৯৭৩ সালের মারদেকা কাপে অংশগ্রহণকারী প্রথম বাংলাদেশ দল নির্বাচন করেন।
১৯৭৮ সালে জার্মান কোচ ভার্নার বিকেলহাউপটের অধীনে অনুষ্ঠিত এএফসি ইয়ুথ চ্যাম্পিয়নশিপ (U-20)–এ তিনি বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার ছিলেন। ১৯৭৯ সালে তিনি বাফুফের সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তী চার মেয়াদে (১৯৭৫, ১৯৭৭, ১৯৮২ ও ১৯৯২–৯৩) নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৮ সালে তিনি দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে অবদানের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ করেন।
দীর্ঘ ফুটবল জীবন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পর ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর বয়স ছিল ৬৯ বছর।
তাঁর অবদান আজও বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একটি ছোট অঞ্চলের ফুটবলারও দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে নিজের ছাপ রাখতে পারে।
নুরুন্নবী চৌধুরী ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি একাধারে খেলোয়াড়, অধিনায়ক, সংগঠক ও পথপ্রদর্শক। তাঁর জীবন এক প্রেরণা, বিশেষ করে তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করেন—প্রতিভা ও অধ্যবসায় থাকলে সীমান্ত কোনো বাধা নয়। তিনি শুধু একটি যুগের প্রতীক নন, বরং বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের এক অনুপ্রেরণার নাম।
Source : wikipedia
Last modified: নভেম্বর ৬, ২০২৫