নুরুন নবী (জন্ম ১৯৪৯) একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, গবেষক, লেখক ও মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি বিজ্ঞান, সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও জনসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন। কোলগেটের বিশ্বখ্যাত পণ্য ‘কোলগেট টোটাল’-এর সহ–উদ্ভাবক হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। পাশাপাশি ‘বুলেটস অব ’৭১ – অ্যা ফ্রিডম ফাইটারস স্টোরি’সহ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনার মাধ্যমে তিনি ইতিহাস ও মানবতার পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

১৯৪৯ সালে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার খামারপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া নুরুন নবীর শৈশব কেটেছে এক গুণী পরিবারের পরিবেশে। স্থানীয় হেমনগর শশীমুখী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে তার মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় এবং ১৯৬৭ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা শুরু করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৮০ সালে কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর ১৯৮৪ সালে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আণবিক জীববিজ্ঞানে পোস্টডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষে নুরুন নবী ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কোলগেট-পামঅলিভ কোম্পানিতে বৈজ্ঞানিক গবেষক হিসেবে যোগ দেন। তার গবেষণা ও উদ্ভাবনী দক্ষতার ফলেই কোলগেটের অন্যতম সফল পণ্য ‘কোলগেট টোটাল’ বাজারে আসে। তিনি ওরাল কেয়ার রিসার্চের অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর অব টেকনোলজি পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং নিজের নামে ১০০টিরও বেশি পেটেন্ট অর্জন করেন। দীর্ঘ ২২ বছরের কর্মজীবন শেষে ২০০৬ সালে কোলগেটের সহকারী পরিচালক হিসেবে অবসর নেন। বিজ্ঞান ও গবেষণায় তার অসামান্য দক্ষতা তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক স্বীকৃত বিজ্ঞানীতে পরিণত করেছে।

১৯৭১ সালে ঢাকায় অবস্থানরত ছাত্র নুরুন নবী সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ২৬ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে আহত হলেও সুস্থ হয়ে তিনি টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দেন এবং কাদের সিদ্দিকীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে যুদ্ধ–পরিকল্পনা, তথ্য আদান–প্রদান এবং অস্ত্র সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনেও তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধের সময় তার নিখুঁত পরিকল্পনা ও কৌশলগত দক্ষতার জন্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাকে ‘দ্য ব্রেইন অব কাদেরিয়া বাহিনী’ হিসেবে উল্লেখ করে।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের পর নুরুন নবী প্রবাসী বাংলাদেশিদের খবর ও সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে ‘প্রবাসী’ নামে একটি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন, যার সম্পাদক তিনি নিজেই। পাশাপাশি তিনি লিখেছেন বহু আলোচিত গ্রন্থ—

  • আমার একাত্তর আমার যুদ্ধ (২০০৪)

  • জন্মেছি এ বাংলায় (২০০৬)

  • আমেরিকায় জাহানারা ইমামের শেষ দিনগুলি (২০১৫)

  • জন্ম ঝড়ের বাংলাদেশ (২০১৭)

  • চার তারার আলো (২০১৯)

তার লেখা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

কর্মজীবন শেষে ২০০৭ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং একই বছর নিউজার্সির প্লেইন্সবোরো টাউনশিপ কমিটির কাউন্সিলম্যান নির্বাচিত হন। তিনি টানা চার মেয়াদে এ দায়িত্ব পালন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা ছাড়াও তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন ফোবানা প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন এবং বঙ্গবন্ধু পরিষদের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৭৪ সালে তিনি বিজ্ঞানী জিনাত নবীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দুই পুত্রসন্তান রয়েছে। ১৯৯৩ সাল থেকে তিনি পরিবারসহ প্রিন্সটন ম্যানরে বসবাস করছেন। বিজ্ঞান ও সমাজসেবায় তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি গ্লোবাল টেকনোলজি অ্যাওয়ার্ডসহ একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপ এবং ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদক তাকে প্রদান করা হয়।

সূত্র : wikipedia

Was this article helpful?
YesNo

Leave a Reply

Close Search Window