নুরুল হক বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন পরিচিত প্রশাসক ও সমাজসেবীর নাম। তিনি ১৮৯৫ সালের মার্চ মাসে নোয়াখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই নুরুল হকের ব্যক্তিত্বে লক্ষণীয় ছিল সততা, নিষ্ঠা এবং নেতৃত্বগুণ। তাঁর পরিবার শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল। পিতা, মরহুম হাসান, শিক্ষা অর্জনের পর ১৯১৮ সালে বি.এ. পাস করে রেজিস্ট্রেশন বিভাগের সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। পিতার প্রজ্ঞা, পরিশ্রম এবং সমাজসেবার মানসিকতা নুরুল হকের চরিত্রে গভীর প্রভাব ফেলে।
শৈশব ও কৈশোরে নুরুল হক নিজের শিক্ষাজীবনে মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তার পিতার দিকনির্দেশনায় তিনি শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্বের মূল্য বোঝেন। পড়াশোনা ও নৈতিক গুণাবলীর সমন্বয় নুরুল হককে এমন একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে, যিনি শুধু নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও দায়িত্বশীল ছিলেন।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে নুরুল হকের অবদান অসাধারণ। তিনি ডি.আই.টি (বর্তমানে রাজউক) এর ট্রাস্টি এবং কৃষি উন্নয়ন ঋণদান সংস্থার আধিকারিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দক্ষতা ও ন্যায্যতার কারণে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর সুষ্ঠু ও দায়িত্বশীল ভূমিকা দেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। শেষ পর্যন্ত তিনি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন, যেখানে তিনি সততা ও নৈতিকতার মাধ্যমে উদাহরণ স্থাপন করেছেন।
নুরুল হকের সমাজসেবার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ১৯৬১ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকাস্থ নোয়াখালী সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সমিতির মাধ্যমে তিনি নোয়াখালীর মানুষের কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ নেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের জীবনের মান উন্নয়নে তাঁর প্রচেষ্টা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তা আজও মানুষের মনে প্রেরণার উৎস হিসেবে রয়ে গেছে।
তার অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে বৃটিশ সরকার তাঁকে প্রথমে ‘খানসাহেব’ এবং পরবর্তীতে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করে। এই সম্মানপ্রাপ্তি তাঁর ব্যক্তিগত দক্ষতা, সততা এবং সমাজসেবায় নিবেদনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি দেয়। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে, সত্যিকারের নেতা কেবল পদ বা ক্ষমতার জন্য নয়, বরং মানুষের কল্যাণ ও ন্যায্যতার জন্য কাজ করে।
নুরুল হক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নৈতিকতা ও দায়িত্বের উদাহরণ স্থাপন করেছেন। প্রশাসনে সততা, সমাজসেবায় আন্তরিকতা এবং নেতৃত্বে দূরদর্শিতা তাঁর কর্মজীবনের মূল চরিত্র। তার জীবন প্রমাণ করে যে, মানুষের কল্যাণে নিবেদিত মনোভাব এবং সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে সমাজে স্থায়ী প্রভাব তৈরি করা সম্ভব।
৭ মার্চ ১৯৭৪ সালে নুরুল হক প্রয়াণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরেও তাঁর অবদান ও জীবনকথা নোয়াখালী ও বাংলাদেশের মানুষের মনে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়ে গেছে। তিনি যেভাবে প্রশাসন ও সমাজসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, তা আজও নতুন প্রজন্মের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
সুত্র: নোয়াখালীর চরিতাভিধান
লেখক : জাহিদুল গণি চৌধুরী
Last modified: অক্টোবর ১২, ২০২৫